কেন সাকিব-মুশফিকরা অধিনায়ক হতে চান না?

, ডেস্ক : দেশের ক্রিকেটে বেশ বড় একটি ক্লান্তিলগ্ন চলছে। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে ক্রিকেটারদের বাজে পারফর্মেন্স, দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি- সব মিলিয়ে বেশ অস্থির হয়ে আছে দেশের ক্রিকেটাঙ্গন। মাশরাফি বিন মুর্তজা ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে চলে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্ব নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। বিশেষ করে সম্প্রতি সাকিব আল হাসান এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের পৃথক পৃথক মন্তব্যে বিষয়টি আবারো সামনে এসেছে।

চট্টগ্রামে আফগানিস্তানের সাথে টেস্টে হেরে যাওয়ার পর ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনেও নিজের হতাশা গোপন করেননি সাকিব আল হাসান। সেসময় তিনি বলেন, ‘আমাকে অধিনায়ক না রাখলেই ভালো হয়, যদি রাখা হয় সেক্ষেত্রে আমার কিছু বিষয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।’

যদিও সেই ‘কিছু বিষয়’ নিয়ে গণমাধ্যমে খোলাসা করেননি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা সাকিব। এর আগে সাকিব আল হাসান দুই বার সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়কত্ব নিয়ে অনাগ্রহের কথা জানান। অন্যদিকে ত্রিদেশীয় সিরিজের শেষে সংবাদ সম্মেলনে দলের সহ-অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বলেন, যদি অধিনায়কত্বের সুযোগ আসে তাহলে সেটা নিতে তিনি প্রস্তুত আছেন।

কেন অধিনায়ক হতে চান না সিনিয়ররা?

মুশফিকুর রহিম ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে বাংলাদেশের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন, মূলত ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট সিরিজের পর টেস্টে অধিনায়কত্ব হারান মুশফিক। এর মাঝে ছোট ছোট সময়ের জন্য মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে ৬ ম্যাচে ও তামিম ইকবালকে এক ম্যাচের জন্য অধিনায়ক করা হয়। কিন্তু ঘুরে ফিরে আবারও সাকিব আল হাসানকে অধিনায়কের দায়িত্ব দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।

সাকিব আল হাসান ২০১৭-১৮ মৌসুমে দুটো সিরিজে ছুটি চান সেসময়ই মূলত তাকে অধিনায়ক করে দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।এদিকে গত বছরের জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে বিপর্যয়ের পর ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট গণমাধ্যমকে বলেছিলেন যে, সাকিব টেস্ট ক্রিকেট খেলতে চান না। তার দাবি ছিল, সিনিয়র ক্রিকেটারদের অনেকে টেস্ট ক্রিকেটে আগ্রহী নয়। যদিও ২০১৭ সালে সাকিব নিজেই বলেছিলেন, তার ইচ্ছা সবার শেষে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়ার, টেস্টের আগে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ছাড়বেন তিনি।

অন্যদিকে মুশফিকুর রহিম মূলত উইকেটের পেছনে দায়িত্ব পালন ও ব্যাটিংয়ে মনোযোগী হওয়ার কারণ দেখিয়ে অধিনায়কত্বের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মুশফিকুর রহিমকে সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে খানিকটা অভিমানের সুরে তিনি গণমাধ্যমে বলেন, অধিনায়ক হিসেবে তার আর দেয়ার কিছু নেই, আর অধিনায়ক হতে চাননা তিনি।

অধিনায়কত্ব হারানোর পর গণমাধ্যমে মুশফিক যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন, যাতে মনে হয়েছে তার অধিনায়কত্ব যেভাবে নিয়ে নেয়া হয়েছিল সেটা তার ভালো লাগেনি। তার অধিনায়কত্ব নিয়ে নানা কথা হলেও বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে অন্যতম সফল অধিনায়ক তিনি। বিশ্বকাপের পরে ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফির ইনজুরি ও সহ-অধিনায়ক সাকিবের বিশ্রামের কারণে শ্রীলঙ্কা সফরে অধিনায়ক হওয়ার প্রস্তাব এসেছিল মুশফিকুর রহিমের কাছে। কিন্তু তিনি ফিরিয়ে দেওয়ায় পরে তামিম ইকবালকে অধিনায়ক করে পাঠানো হয়। সেই সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয় বাংলাদেশ।

তামিম ইকবাল সদ্য শেষ হওয়া ত্রিদেশীয় সিরিজে ছুটি চেয়ে বিশ্রামে ছিলেন, তিনি বিশ্বকাপের পর শ্রীলঙ্কা সফরে ব্যর্থ হওয়ার কারণে মানসিক চাপ কাটাতে ছুটি নিয়েছেন বলে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। মাশরাফি বিন মুর্তজা ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়ার পরে ওয়ানডে ক্রিকেটেও নতুন অধিনায়কের কথা ভাবতে হবে ক্রিকেট বোর্ডকে। বিশ্বকাপের পরপর হওয়া শ্রীলঙ্কা সফরে মাশরাফি ইনজুরিতে থাকায় সেই সিরিজে নেতৃত্ব দেন তামিম ইকবাল, এই সিরিজটিতে ৩-০ ব্যবধানে হারে বাংলাদেশ।

সমস্যা কি বোর্ডের পেশাদারিত্বে?

ক্রীড়া বিশ্লেষকেদর সাথে আলাপ করে বোঝা যাচ্ছে, বোর্ডের মধ্যে ‘পেশাদারিত্বের অভাব’ টাইকে দায়ী করছেন অনেকে। এমনিতে সাকিব খুব কম বয়সে দলের নেতৃত্ব দেন, মুশফিক সবসময় বলে আসছেন যে অধিনায়কত্ব উপভোগ করেন। তামিম ইকবাল বিভিন্ন মেয়াদে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ২০১৭ সালে যখন সাকিব আল হাসানকে টেস্ট অধিনায়ক করা হয়, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে সহ-অধিনায়ক করে দেয়া হয়, এর আগেও ২০১৪ সালে এমন ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপনের কাছে তামিমের সহ-অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রশ্ন রাখা হলে তিনি বলেন, তিনি জানতেন না তামিম ইকবাল সহ-অধিনায়ক ছিলেন।

অধিনায়কত্ব চাপিয়ে দেয়ার ফল ভালো হবে না

অধিনায়কত্ব বিষয়টি কারো উপর চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষে না বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘অধিনায়ক হতে চাইলেই হয়ে যাবে ব্যাপারটা এমন না, আবার বোর্ড যদি কাউকে পছন্দ করে তারও ইচ্ছার ব্যাপার আছে, কোনো কিছু যদি চাপিয়ে দেয়া হয় সেটার ফলও ভালো হবে না।’

ক্রিকেটের মাঠে অধিনায়কের দায়িত্ব অনেক বলে মনে করেন তিনি, এখানে শুধু যে মাঠের ভূমিকা প্রভাব ফেলে তা নয়, ‘পুরো সিস্টেমে অধিনায়কের একটা সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলতে পারে। সাকিব খেলোয়াড় হিসেবে যতটা উচ্চতায় গিয়েছে, অধিনায়ক হিসেবে কিন্তু ওরকম হয়নি, একবার ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কত্ব করেছে মাশরাফি ইনজুরিতে ছিল যখন। সিরিজ জিতেছে ঠিক, কিন্তু সে কখনো লম্বা সময় দায়িত্ব পালন করেনি।’

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকেও অধিনায়ক হওয়ার যোগ্য বলে মনে করেন ফারুক আহমেদ। তবে সাকিব আল হাসান যেহেতু গণমাধ্যমকে বলেছে যে বোর্ডের সাথে আলোচনার বসবে, তাই এই বিষয়টি বোর্ডের নিষ্পত্তি করে ফেলা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি, ‘সাকিবের সাথে জিনিসটা ঠিক করা দরকার, কারণ দলে জায়গাটা ওর নিশ্চিত। কিন্তু অধিনায়কত্ব করতে হবে খুশি মনে। সাকিব হয়তো আরেকটু অথরিটি (কর্তৃত্ব) চায়, সেটা যদি বোর্ড দিতে না পারে সেটাও আলোচনা করে পরিষ্কার হওয়া উচিত।’

সিদ্ধান্ত কীভাবে হয়?

দলের মধ্যে অধিনায়কত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় কিনা- এমন প্রশ্নে ক্রিকেট বোর্ডের একজন পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি বলেন, ‘এরকম সমস্যা হয় বলে আমি মনে করি না। মাঝে মধ্যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, বিভিন্ন অভিব্যক্তি আসে নানা সময়, তার মানে এই না যে জোর করে দেয়া হয়েছে। আমার ধারণা এগুলো একটা প্রক্রিয়া, ক্রিকেট অপারেশন্স ও বোর্ডের উর্ধ্বতন তারা আলোচনা করেই সিদ্ধান্তে উপনীত হন।’

সাকিবের বিষয়টি নিয়ে বোর্ডের ক্রিকেট অপারেশন্সের প্রধান আকরাম খান বলেন, ‘এখন এসব নিয়ে কথা বলছে মিডিয়া, সাকিব ক্রিকেট অপারেশন্সকে অধিনায়কত্ব নিয়ে কিছুই জানায়নি, তো এটা নিয়ে আসলে সাকিবের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে কথা বলা উচিত হবে না। তামিম শুধু একটি শ্রীলঙ্কা ট্যুরে অধিনায়কত্ব করেন, কারণ তখন সাকিব যায়নি। সাকিব আসার পর সে তা করছে, অফিশিয়ালি সাকিব কিছুই জানায়নি, তাই আমরা এবিষয়ে আমরা তেমন কিছুই ভাবছি না। সাকিব যেহেতু আছে, আমাদের সব পরিকল্পনা সাকিবকে ঘিরে।’

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন