জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ, তবুও কেন কিনতে পারছে না গরিবরা

, ডেস্ক : মেঘনা ও পদ্মাসহ সংযুক্ত নদীগুলোতে এক সময় জাল ফেললেই পাওয়া যেতো ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। প্রবীণ লোকেরা বলতেন, নদীতে ইলিশের মাথা যেনো ইলিশেই খেতো। আশির দশকে ও নব্বইর দশকে যতোগুলো প্রলয়ঙ্করী বন্যা হয়েছে, সে বন্যার পানির তোড়ে ইলিশ পদ্মা ও মেঘনার সাথে সংযুক্ত নদীগুলোতেই শুধু ছুটে যায়নি, গভীর খাল ও পুকুরেও গিয়েছে। খাল ও পুকুর থেকে ইলিশ মাছ ধরার খবর প্রায়শই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতো।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রবল বন্যাতে পুকুর ও খাল দূরে থাক, মেঘনা ও পদ্মা সহ ভাটি অঞ্চলের কিছু নদী ছাড়া উজানের নদীগুলোতে ইলিশ দুষ্প্রাপ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি পদ্মা ও মেঘনা নদীর পুরো অংশে ইলিশের সহজপ্রাপ্যতা ক্রমশ কমে এসেছে।

এ নিয়ে মৎস্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে যারা ইলিশ গবেষক তাঁরা বলেছেন ও বলছেন নানা কথা এবং কারণ অনুসন্ধান করে সরকারকে দিয়েছেন নানা দিক নির্দেশনা। সেমতে সরকারও বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু মেঘনার উজানে চাঁদপুর অঞ্চলে ও পদ্মায় মিলছে না পূর্বের ন্যায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রার পর্যাপ্ত ইলিশ।

মেঘনার ভাটি অঞ্চলসহ সংযুক্ত নদীগুলো ও সাগর থেকে আহরিত ইলিশের আমদানিতে ভরা মৌসুমে জমজমাট হচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ ইলিশের বাজার চাঁদপুর মাছঘাট। এ ঘাটের নিকটবর্তী পদ্মা-মেঘনায় স্বাদে সেরা ইলিশের দেখা খুব একটা মিলছে না এবং কালেভদ্রে দেখা মিললেও দুর্মূল্যে স্থানীয় সাধারণ ও গরিব ক্রেতাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

মৎস্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইলিশ মাছের প্রিয় খাবার প্রাণীজ প্লাংটন ও উদ্ভিজ্জ প্লাংটন চাঁদপুর এলাকার মেঘনা ও পদ্মা নদীতে পর্যাপ্ত ও উন্নত মানেরটা জন্মায় বলে এগুলো খেয়ে ইলিশ মাছ চর্বিতে হৃষ্টপুষ্ট ও স্বাদপূর্ণ হয়। সেজন্যেই চাঁদপুরের ইলিশের জগৎজোড়া খ্যাতি।

অভিজ্ঞজনরা বলছেন, মেঘনা ও পদ্মার তলদেশ ক্রমশ পলিতে ভরাট হতে থাকায় গভীরতা হ্রাস পেয়েছে এবং সাগর থেকে এ দুটি নদী অভিমুখে ইলিশের গতিপথে ডুবোচর জন্মেছে বলে ইলিশ পূর্বের ন্যায় চাঁদপুর এলাকায় স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করতে পারে না। সেজন্যে এখানে অন্যান্য মাছ পাওয়া গেলেও ইলিশ পর্যাপ্তভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। আর এই কারণহেতু ইলিশের দাম কমছে না।

স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীরা ভাটির অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত ইলিশকে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও গরিবদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখছেন না। এর নেপথ্য কারণ, দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্যে দুর্মূল্য হলেও ইলিশের রয়েছে অসম্ভব চাহিদা। সে বৈধ-অবৈধ চাহিদা পূরণে স্থানীয় ক্রেতাদের নিরুৎসাহিত করতে সিন্ডিকেট করে মৎস্য ব্যবসায়ীরা পচে যাওয়ার উপক্রম হলেও ভরা মৌসুমে পর্যন্ত ইলিশের মূল্য কমাতে রাজি হচ্ছে না বলে পর্যবেক্ষণকারী অভিজ্ঞজনের অভিমত।

আমরা এ অভিমতের সত্যতা যাচাইয়ে সরকারকে আন্তরিকভাবে কাজ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় ক্যাপিটাল ড্রেজিং করে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি, কারেন্ট জাল উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সকল বাধা অপসারণ, দু মাস অভয়াশ্রম চলাকালে ও মা ইলিশ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের মাছ ধরা থেকে নিবৃত্ত রাখার কার্যকর পন্থা অবলম্বন, নৌ-পুলিশকে সক্রিয়করণসহ সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

অন্যথায় দুষ্প্রাপ্যতা ও দুর্মূল্যে ইলিশ কৃত্রিম সম্ভ্রান্তি অর্জন করে ধনীদের বিলাসী পণ্যে পরিণত হবে, আর গরিবদের অসামর্থ্যে হাহাকারের শিকার হবে। এটা কাম্য হতে পারে না।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন