টাকা দিলেই মিলছে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট

, চট্টগ্রাম : বিদেশে যাওয়ার জন্য ভুয়া ঠিকানা দিয়ে করাতে গিয়ে প্রায়ই ধরা পড়ছে রোহিঙ্গারা। আটক হওয়ার পর এসব জানান, দিলে দালালরাই ভুয়া জন্মসনদ ও () বানিয়ে তা দিয়ে আবার পাসপোর্ট তৈরি করিয়ে দেয়। এ তথ্য যাচাই করতে গিয়ে পাওয়া গেছে আরও চমকপ্রদ তথ্য। রোহিঙ্গারা যা বলেছেন সে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে পাসপোর্ট অফিস বলছে, ভেরিফিকেশনের সময় সতর্ক থাকলে এভাবে পাসপোর্ট তৈরি বন্ধ হয়ে যাবে। এদিকে, সতর্কতার সঙ্গে ভেরিফিকেশন করা হয় দাবি করে বলছে, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট তৈরির পেছনে জনপ্রতিনিধি ও কার্যালয়ের কর্মকর্তারাই বেশি দায়ী। এ ব্যাপারে কার্যালয় জানায়, জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার বেলায় জনপ্রতিনিধিরা যত্নশীল হলে রোহিঙ্গারা জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন করারই সুযোগ পায় না। একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশন কার্যালয় জানায়, কাগজপত্রে না থাকলেও তাদের সার্ভারে ভুয়া এনআইডি’র তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এগুলো কীভাবে সার্ভারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তারা কিছু জানেন না।

ঢাকায় তুরস্কের দূতাবাসে যাওয়ার সময় চট্টগ্রাম নগরীর আকবর শাহ এলাকা থেকে বাংলাদেশি তিন পাসপোর্টসহ তিন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে পুলিশ। (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে তাদের আটক করা হয়। তুরস্ক যাওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তারা দূতাবাসে যাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এভাবে পাসপোর্টসহ রোহিঙ্গাদের আটক হওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, রোহিঙ্গারা কীভাবে পাসপোর্ট তৈরি করেন? এরজন্য জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আনুসাঙ্গিক আরও কাগজপত্র লাগে, রোহিঙ্গারা তা কীভাবে সংগ্রহ করেন?

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আকবর শাহ থানার মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আকবর শাহ এলাকা থেকে আটক তিন রোহিঙ্গা জানিয়েছে, দালালকে টাকা দিয়ে তারা পাসপোর্টগুলো তৈরি করিয়েছে। তিন পাসপোর্টের জন্য তারা দালালকে দুইলাখ ৫৫ টাকা দিয়েছে। এর মধ্যে ইউসুফ পাসপোর্টের জন্য দালালকে দিয়েছে ১০৫ টাকা, মুসা দিয়েছে ৯০ এবং আজিজ দিয়েছে ৬০ টাকা। এরপর সব কাগজপত্র ম্যানেজ করে দালালরাই তাদের পাসপোর্ট তৈরি করে দিয়েছে।’

শুধু এই তিনজন নয়, এভাবে দালালদের মাধ্যমে অসংখ্য রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরি করছেন। এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর পাসপোর্টসহ ধরা পড়েছেন আরও এক রোহিঙ্গা। নজির আহমদ নামের ওই রোহিঙ্গাকে সৌদি আরব যাওয়ার সময় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করে পুলিশ। তারও আগে পাসপোর্ট করতে গিয়ে নজিরের স্ত্রী রমজান বিবি আটক হন। লাকি আক্তার নাম দিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন ওই নারী।

এ ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, ওই নারীর স্বামী নজির আহমদও একজন রোহিঙ্গা। নজির আহমদ ২০১২ সালে চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকার ঠিকানা ব্যবহার করে বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরি করেন। এরপর ২০১৬ সালে সৌদি আরব পাড়ি জমান।

পুলিশ জানায়, রমজান বিবি তাদের বলেছেন, তার স্বামী নজির আহমদের পরামর্শে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন তিনি। তবে স্থানীয় ওই ব্যক্তির বিষয়ে বিস্তারিত কোনও তথ্য দিতে পারেননি এই রোহিঙ্গা নারী।

লাকী আক্তারের মতো এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করছেন রোহিঙ্গারা। পরে এসব জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরি করে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।

পাসপোর্ট অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ মাসে চট্টগ্রামে অন্তত ৮০ জন রোহিঙ্গা পাসপোর্ট করতে এসে ধরা পড়েছেন। এর মধ্যে গত এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত নগরীর পাঁচলাইশের আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ে পাসপোর্ট করতে এসে ধরা পড়েছেন ২৮ জন রোহিঙ্গা। একই সময়ে মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট করতে এসে ধরা পড়েছেন অন্তত ৫০ জন। সর্বশেষ গত এক সপ্তাহে ধরা পড়েছেন দুইজন। এর মধ্যে শফিকুল হাই নামে একজন গত বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ধরা পড়েন। তারা সবাই জালিয়াতির মাধ্যমে জন্মসনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট করার চেষ্টা করেন। ভুয়া নাম-ঠিকানা নিয়ে কিংবা পরিষদ কার্যালয় থেকে এইসব সনদ নিয়েছেন তারা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের উপ- আবু সাঈদ বলেন, ‘পাসপোর্ট করার জন্য রোহিঙ্গারা যদি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ যাবতীয় শর্ত পূরণ করে, তখন তাদের ধরার কোনও সুযোগ থাকে না। শুধু কথাবার্তায় সন্দেহ হলে আমরা তাদের শনাক্ত করতে পারি। পাসপোর্টের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের বেলায় কঠোরতা আরোপ করা হলে রোহিঙ্গারা আর পাসপোর্ট করতে পারবে না।’

এর জন্য তিনি পুলিশ ভেরিফিকেশন ও জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের আরও সর্তক হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘ভেরিফিকেশনে পুলিশ যদি আরও সতর্ক হয়,তাহলে রোহিঙ্গারা পাসপোর্ট করতে পারবে না। পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা যদি জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে সর্তকতা অবলম্বন করেন, তাহলে এটি রোধ করা সম্ভব হবে।’

তবে পুলিশ বলেছে, এর জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নির্বাচন কমিশনই বেশি দায়ী। নগর পুলিশের (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) উপ-কমিশনার আব্দুল ওয়ারিশ বলেন, ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন হচ্ছে তৃতীয় ধাপ। এর আগে প্রথম ধাপে রোহিঙ্গারা জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে জন্মসনদ, সনদ সংগ্রহ করে। পরে দ্বিতীয় ধাপে এগুলোর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের অফিস থেকে তারা জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে। প্রথম এবং দ্বিতীয় ধাপে কর্মরত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যদি সর্তকতার সঙ্গে কাজ করে, তাহলে রোহিঙ্গারা পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতেই পারে না।’ তিনি জনপ্রতিনিধি ও নির্বাচন কমিশনের -কর্মচারীদের এনআইডি দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও যত্নশীল হওয়ার আহ্বান জানান। তবে পুলিশও এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলেও জানান তিনি।

আব্দুল ওয়ারিশ বলেন, ‘ভেরিফিকেশন রিপোর্টের ক্ষেত্রে পুলিশ যদি আরও যত্নবান হয়, তাহলে রোহিঙ্গারা পাসপোর্ট তৈরি করতে পারবে না। রোহিঙ্গারা যাতে পাসপোর্ট না পায়, সেটি মাথায় রেখে পুলিশ এখন কাজ করছে।’

পাসপোর্ট করতে এসে ধরা পড়া রোহিঙ্গাদের প্রায় সবাই আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিয়েছেন। কীভাবে রোহিঙ্গারা জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন তা জানেন না খোদ নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা।

স্মার্টকার্ড সংগ্রহ করতে গিয়ে রোহিঙ্গা নারী রমজান বিবি ধরা পড়েন গত ১৮ আগস্ট। রমজান বিবির কাছ থেকে জব্দ করা জাতীয় পরিচয়পত্রের বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের ডাটাবেজে এরকম অন্তত ৭৩টি সন্দেহজনক আবেদন পেয়েছে তদন্ত । তবে কোনও নির্বাচন কার্যালয় থেকে এই আবেদনগুলো আপলোড করা হয়েছে সেটি এখনও জানতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। ইসির সার্ভারে ভুয়া এনআইডি কীভাবে হলো, কোন জায়গা থেকে করা হয়েছে, এনআইডির ক্রমিক নম্বরের ফরম কোথা থেকে সরবরাহ করা হয়েছে—এসব কোনও তথ্যই এখন পর্যন্ত বের করতে পারেনি জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুনির হোসাইন বলেন, ‘রমজান বিবির জাতীয় পরিচয়পত্র তদন্ত করতে গিয়ে আমরা সার্ভারে এমন আরও ৭৩টি সন্দেহজনক আবেদন পেয়েছি। সার্ভারে এনআইডিগুলোর তথ্য থাকলেও কাগজপত্রে কিছু নেই। এগুলোর সিরিয়ালও এলোমেলো। কীভাবে এগুলো সার্ভারে অন্তভুর্ক্ত করা হয়েছে—এটি আমরা নিশ্চিত নই। আমরা বিষয়টি প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করেছি। টেকনিক্যাল টিম এটি বের করতে কাজ করছে।’

নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীলতার অভাবে রোহিঙ্গারা জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি সুযোগ পাচ্ছেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি ঠিক নয়। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা অনেক যাছাই-বাছাই করেন। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যখন স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে কাউকে শনাক্ত করেন, তখন কর্মকর্তাদের কিছু করার থাকে না। এরজন্য জনপ্রতিনিধিরাই দায়ী। তাদের এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।’