বেরিয়ে আসছে থলের বিড়াল, তালিকা দেখে বিস্মিত গোয়েন্দারা

, ডেস্ক : ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে জড়িত বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার অঢেল অর্থ-সম্পদের সন্ধান মিলেছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে। সেখানে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থ।

থাইল্যান্ডে অবস্থানরত এক হুন্ডি মাফিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করেন খালেদ। ক্যাসিনোর অর্থ ছাড়া যুবলীগ নেতা খালেদ রেলওয়ের ঠিকাদারি কাজের নামে প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নেন। এ ছাড়া রাজধানীর একটি বিশাল অংশজুড়ে তার চাঁদাবাজি ছিল ওপেন সিক্রেট।

সূত্র বলছে, ব্যাংককে বসবাসরত এক বাংলাদেশি হুন্ডি কিং বা হুন্ডি মাফিয়া হিসেবে পরিচিত। নাম তার শাহিন ওরফে শাহিন চৌধুরী। কেউ বলেন ‘হুন্ডি শাহিন’। বাংলাদেশ থেকে শত শত কোটি টাকা তার মাধ্যমেই পাচার করা হয়। হুন্ডি ব্যবসার মাধ্যমে শাহিন থাইল্যান্ডে বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন।

সূত্র বলছে, শুধু খালেদ একা নন, বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বিপুল অঙ্কের অর্থ থাইল্যান্ডে পাচার করেছেন। এ তালিকায় আছেন এমপি, মন্ত্রী, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, পুলিশ অফিসার, ব্যবসায়ী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে।

বাংলাদেশ থেকে পাচার করা এসব টাকা থাইল্যান্ডে বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। রাজধানী ব্যাংকক, পাতায়া ও ফুকেটসহ বেশ কয়েকটি পর্যটন শহরে আবাসন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও শপিং মল গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি টাকায়। বহু বাংলাদেশি কোটি টাকা খরচ করে থাইল্যান্ডে বসবাসের জন্য স্থায়ী ভিসা সুবিধাও নিয়েছেন।

হুন্ডি কিং শাহিন ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির ঘটনায় বিদেশে টাকা পাচারের তথ্য উঠে আসার পর হুন্ডি মাফিয়াদের খোঁজে অনুসন্ধান শুরু করেন গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যে থাইল্যান্ডের হুন্ডি কিং শাহিনের বিষয়েও খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। গোপনে হুন্ডি কারবারে জড়িত থাকলেও শাহিন চৌধুরী রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংককে রাঁধুনি রেস্টুরেন্টের মালিক তিনি।

এ ছাড়া বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের কাছে রোয়াম রুডি এলাকায় তার আবাসিক ফ্ল্যাট ভাড়ার ব্যবসা রয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবসা থেকে আয়ের সঙ্গে তার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো মিল নেই।

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা বা ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে রাতারাতি শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। অথচ শাহিন চৌধুরী ব্যাংককে লেটেস্ট মডেলের বিএমডব্লিউ গাড়িতে চড়েন। পায়ধা চৌধুরী নামের এক থাই নারীকে বিয়ে করে সে দেশের পাসপোর্ট পান।

বাংলাদেশি হলেও থাই ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন শাহিন চৌধুরী। অথচ বাবর নামের চট্টগ্রামের জনৈক রাজনৈতিক নেতার হাত ধরে আশির দশকে থাইল্যান্ডে পাড়ি জমান শাহিন। প্রথমদিকে বাবরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ফুটফরমাশ খাটতেন।

একপর্যায়ে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারে সহায়তা করতেন। পরে পুরোদস্তুর হুন্ডি ব্যবসায় নাম লেখান। এখন তিনি থাইল্যান্ডে হুন্ডি কিং নামে পরিচিত। হুন্ডির পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাকারবারে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

সূত্র বলছে, থাইল্যান্ডে ৭ মিলিয়ন বাথ (থাই মুদ্রা) বিনিয়োগ করলে বিদেশি নাগরিকদের ২০ বছর মেয়াদি ভিসা বা স্থায়ী থাই ভিসা দেয়া হয়। সাত মিলিয়ন থাই বাথ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি টাকা।

এ ছাড়া বহু বাংলাদেশি দুই থেকে আড়াই কোটি টাকায় ফ্ল্যাট কিনে স্থায়ী ভিসা নিয়েছেন। অনেক বাংলাদেশি বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে থাইল্যান্ডে খুলেছেন আবাসন ব্যবসা। হুন্ডি কারবারের সহজলভ্যতার কারণে থাইল্যান্ডে অর্থ পাচার অনেকটা ডাল-ভাতের মতো।

এ ছাড়া দুর্নীতির টাকা লুকিয়ে রাখতে অনেক সরকারি কর্মকর্তা ও অসৎ রাজনৈতিক নেতারা থাইল্যান্ডে নিরাপদ বিনিয়োগের পথ বেছে নেন।

প্রায় ৪০ বছর থাইল্যান্ডে বসবাস করছেন এমন একজন বাংলাদেশি বলেন, বাংলাদেশ থেকে যারা থাইল্যান্ডে টাকা পাচার করেন তাদের কাছে ২ কোটি টাকা কিছুই না। বলা যেতে পারে, তাদের হাতের ময়লা। কারণ শত শত নয়, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে থাইল্যান্ডে।

সূত্র জানায়, র‌্যাবের হাতে সম্প্রতি গ্রেফতার সেলিম প্রধান ওরফে থাই ডন সেলিম থাইল্যান্ডের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। বৈধ কোনো আয়ের উৎস না থাকলেও থাইল্যান্ডের পাতায়া শহরে তার শতকোটি টাকার ব্যবসা রয়েছে। বাংলাদেশের বহু প্রভাবশালী ব্যাংকক গেলে সেলিম প্রধানের বাসায় থাকতেন। কারণ সেলিম প্রধান তাদের জন্য সব মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করে রাখতেন। বিনিময়ে পেতেন বাংলাদেশে আরও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের অদৃশ্য চাবিকাঠি।

সেলিম প্রধানের অর্থ পাচার প্রসঙ্গে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, থাইল্যান্ডে সেলিম প্রধানের বিপুল অঙ্কের অর্থ থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব অর্থ কীভাবে থাইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সে বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।

তিনি বলেন, দেশ থেকে অর্থ পাচার করে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার অর্থই হল দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া। তাই অর্থ পাচারের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের আইনের মুখোমুখি করা হবে।

সূত্র জানায়, থাইল্যান্ডের পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার শীর্ষস্থানীয় হুন্ডি ব্যবসায়ী জনৈক আমিন ওরফে হুন্ডি কিং আমিনের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা পাচার হয়। এ ছাড়া গুলশান আওয়ামী লীগের এক নেতার ভাগিনা শাহিন আহাম্মেদ মালয়েশিয়ায় হুন্ডি মাফিয়া হিসেবে পরিচিত। সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বিনিয়োগকারী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশই শাহিন আহাম্মেদের মাধ্যমে অর্থ পাচার করেন।

ইতিমধ্যে সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বিনিয়োগকারী বাংলাদেশির সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। জানা গেছে, বাংলাদেশি টাকায় ৭৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে মালয়েশিয়ায় স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা দীর্ঘমেয়াদি ভিসা পাওয়া যায়। এমনকি পাচারের টাকায় বহু বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় ‘দাতো’ (মালয়েশিয়ার জাতিগত পদবি) হিসেবে মালয় জাতি-গোষ্ঠীতে ঢুকে পড়েছেন।-যুগান্তর

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন