রাজনীতি কি?

, ডেস্ক : রাজনীতি (ইংরেজি: Politics) হলো কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তিতে গঠিত সামাজিক সম্পর্ক, যার মাধ্যমে কিছু ব্যক্তির সমন্বযয়ে গঠিত কোন গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। রাজনীতি বলতে সাধারনত নাগরিক সরকারের রাজনীতিকেই বোঝানো হয়।

তবে অন্যান্য অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠানেও রাজনীতি চর্চা করা হয়, যেমন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ……………… ইত্যাদি, যেখানে মানুষের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্ক বিদ্যমান।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান হচ্ছে শিক্ষার এমন একটি শাখা যা রাজনৈতিক আচরণ শেখায় এবং ক্ষমতা গ্রহণ ও ব্যবহারের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করে। রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় প্লেটোর রিপাবলিক, এরিস্টটলের রাজনীতি এবং কনফুসিয়াসের কিছু লেখনীতে।

প্লেটো তার দি রিপাবলিক গ্রন্থে সাম্যবাদ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি তৎকালীন আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে সাম্যবাদ-এর ধারণা দিয়েছিলেন। আধুনিক সাম্যবাদ হলো প্লেটোর কাছ থেকে ধার করা সাম্যবাদ। আধুনিক সাম্যবাদে শুধু ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপের কথা বলা হয়। আসলে দেখা যায়, প্লেটোর সাম্যবাদের কিছু অংশ বর্তমানেও বাস্তব।

এরিস্টটলের পলিটিকস বা এরিস্টটলের রাজনীতি এরিস্টটলের লেখা বই, যা লেখা হয়েছে আজ থেকে দুই হাজার ৩০০ বছর (খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৫-৩২২) আগে। ৫০ বছর বয়সে লাইসিয়াম নামের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এরিস্টটল রচনা করেছেন পলিটিকস। সমাজ, রাষ্ট্র, শাসনব্যবস্থা ও নৈতিকতা বিষয়ে এটি পৃথিবীর প্রথম একাডেমিক সন্দর্ভ। এরিস্টটলের মতে, রাজনীতি হলো জনসেবা; জনজীবনের বিষয়বস্তু ও গতিপথ সংক্রান্ত যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণই রাজনীতির সারবস্তু। অর্থাৎ ‘উৎকৃষ্ট জীবন লাভের জন্য যে কোন সমাজের সংগ্রামের নামই হল রাজনীতি’।

কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন, মানুষের মাঝে যদি নৈতিক চরিত্রের উন্নতি না ঘটে, শুধুমাত্র আইন দিয়ে মানুষকে সংযত রাখা সম্ভব নয়। তাছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাও সম্ভব নয়।

এখন নিশ্চয়ই আপনাদের খুব জানতে ইচ্ছে করছে; তাহলে রাজনীতি কি?

আসুন একটা উদাহরন দেওয়া যাক; একদিন এক বাচ্চা ছেলে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলো, বাবা রাজনীতি কি জিনিস?

বাবা বললেন, খুব সুন্দর প্রশ্ন। এসো বুঝিয়ে দেই। ধরো আমি এই পরিবারে আয়-রোজগার করি। অর্থাৎ আমি হচ্ছি পুজিঁবাদিদের প্রতিনিধি। সংসারের কোথায়, কত টাকা, কোন কাজে খরচ হবে সেই সিদ্ধান্ত নেন তোমার মা। তার মানে তোমার মা হচ্ছে সরকার। আমরা দুই জন মিলে তোমাদের যত্ন, রক্ষনাবেক্ষন, ভবিষ্যত …………… চিন্তা ভাবনা করি। সুতরাং তোমরা হলে জনগণ। আর ধরো বাড়ির কাজের মেয়েটা, সে হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষ। তারপর তোমার ছোট ভাই; যে এখনো ফিডার খায়, তাকে বলতে পারো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

ছেলে বললেন, তারপর?

বাবা বললেন, তুমি তোমার নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে বের করো এই লোকগুলোর মধ্যে আসল সম্পর্কটা কি? দেখবে সবকিছু তোমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে।

বাচ্চা ছেলেটা রাজনীতি ও এতোগুলো মানুষের মধ্যে সম্পর্ক কি, এই জটিল হিসেব-নিকেশ মাথায় নিয়ে ঘুমাতে গেল। কিন্তু চিন্তায় তার ঘুম এলো না। সারা রাত বিছানায় ছটফট করতে লাগলো। শেষ রাতের দিকে তার ছোট ভাইয়ের কান্নার শব্দ শুনতে পেল। সে ছোট ভাইয়ের কান্নার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখলো, ছোট ভাই বিছানায় জলবিয়োগ করেছে; তাই কাঁদছে। মা পাশেই নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে, কিন্তু বাবা নেই। বাবাকে শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেল রান্নাঘরে; যেখানে বাড়ির কাজের মেয়েটা ঘুমাচ্ছে। সবকিছু দেখে-শুনে বাচ্চা ছেলেটা নির্বিকার চিত্তে তার বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

পরের দিন সকাল বেলায় খাবার টেবিলে ছেলেটা তার বাবাকে বলল, রাজনীতি জিনিসটা কি, আমি বোধহয় মোটামুটি বুঝতে পেরিছি।

বাবা বললেন, খুবই ভালো; এখন বলো কি বুঝলে?

ছেলেটা বললো, পুজিঁবাদী সমাজ যখন শ্রমজীবী সমাজের ওপর শোষণ-অত্যাচার করে, সরকার তখন নাক ডেকে ঘুমায়। জনগণ সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যায়। আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তখন বাস করে নোংরা পরিবেশে; এটাই রাজনীতি।

তাইতো এরিস্টটল তার পলিটিকস গ্রন্থে লিখেছেন; একটা সরকার তখনই ভালো সরকার, যখন তার লক্ষ্য হয় সমগ্র জনগোষ্ঠীর মঙ্গলসাধন। আর খারাপ সরকার হলো সেই সরকার, যে শুধু নিজের স্বার্থের কথা ভাবে।

রাষ্ট্র কি, কি তার লক্ষ্য বলতে গিয়ে এরিস্টটল বলেছেন ; রাষ্ট্র হলো মানুষের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সমাজ, তার লক্ষ্য সর্বোচ্চ মঙ্গলসাধন, কেননা মানবজাতি সর্বদা কাজ করে মঙ্গল সাধনের উদ্দেশ্যে। অ্যারিস্টটলের বিচারে প্রতিটি নগররাষ্ট্র মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনযাপনের স্বাভাবিক সভ্য রূপ এবং সর্বোত্তম ব্যবস্থা, যার মধ্য দিয়ে মানুষের মানবিক সামর্থ্যের বাস্তবায়ন ঘটবে।

মানুষ সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের একটি বিখ্যাত উক্তি ‘Man is a political animal’ অর্থাৎ অ্যারিস্টটল বুঝাতে চেয়েছেন, ব্যক্তি মানুষ স্বভাবতই একটি পলিটিক্যাল কমিউনিটির অংশ হতে চায়, যে কমিউনিটির লক্ষ্য সব মানুষের সর্বোচ্চ মঙ্গলসাধন। অ্যারিস্টটলের বিচারে মানুষের এই বৈশিষ্ট্য স্বভাবজাত বা ন্যাচারাল। তবে সেই পলিটিক্যাল কমিউনিটি বা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, মানুষ যেন তার স্বাভাবিক সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে গোটা জনগোষ্ঠীর মঙ্গল সাধনে অংশ নিতে পারে।

কিন্তু রাষ্ট্র সেটা নিশ্চিত করবে কীভাবে? অ্যারিস্টটলের বলেছেন; আইন ও ন্যায়বিচারের দ্বারা। অ্যারিস্টটলের ভাষায়; ‘মানুষ, যদি সে খাঁটি হয়, প্রাণীকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু আইন ও ন্যায়বিচার থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সে হয় প্রাণীকুলের মধ্যে নিকৃষ্টতম, কারণ সশস্ত্র অন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।’ আসলে অ্যারিস্টটল বুঝাতে চেয়েছেন, মানুষ জন্ম থেকে দুইটি অস্ত্র প্রাকৃতিকভাবে পেয়ে থাকে; যেমন কথা বলা ও ন্যায়-অন্যায় বিচার করার ক্ষমতা। এই দুটি অস্ত্রে সজ্জিত কোন মানুষ আইন ও বিচারের অধীন না হলে সে হয় পলিটিক্যাল কমিউনিটির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণী।

মেকিয়াভেলী রচিত ‘The Prince’ গ্রন্থটি রাজতন্ত্রের চরিত্র ও স্থায়ীত্ব নিয়ে বলিষ্ঠ বিশ্লেষণ করেছে । তাঁর মতে; রাজনীতি হলো এক বিশেষ রাজত্ব কেন্দ্রিক নীতি বা রাজার নীতি, এটি একটা বিশেষ চেতনা বা আদর্শ।

Dr. Restart K মতে, ‘Politics means who gets, what, when and how’ অর্থাৎ “রাজনীতি হলো কে পায়, কি, কখন এবং কিভাবে পায় তার আলোচনা”।

বি.রাসের মতে, ক্ষমতা তিন প্রকারের। অর্থনৈতিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং পেশী শক্তি। আর এই তিন ধরনের ক্ষমতার সমন্বিত বহি:প্রকাশই হলো রাজনীতি।

সাধারণ অর্থে রাজনীতি বলতে ক্ষমতার লড়াইকে বুঝায়। রাজনীতির মূলে আছে ক্ষমতা। রাজনীতিই নির্ধারণ করে কিভাবে ক্ষমতা অর্জন করা যায়, ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায় এবং ক্ষমতা ব্যবহার করা যায়। প্রাচীন গ্রিক থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক সমাজে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব লক্ষ করা যায়। গ্রিক দার্শনিকদের থেকে জানা যায়, রাজনীতি হলো একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করার প্রক্রিয়া। সাধারণ ভাষায় রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম-রীতিপদ্ধতিকে রাজনীতি বলা হয়ে থাকে। অন্যকথায় রাজনীতি হলো ক্ষমতার পর্যালোচনা। যে যতটা ক্ষমতাধর রাজনীতিতে তার অবস্থানও ততটা জোরালো। রাজনীতি হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মধ্য দিয়ে মানুষ তার রাজনৈতিক আদর্শ অনুসারে নিজের সমাজকে বিন্যস্ত করে। শাসন ও শাসিতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয় রাজনীতির মাধ্যমেই।

উপরিক্তউক্ত আলোচনা হতে আমরা এই সংজ্ঞায় উপনীত হতে পারি যে, একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতা ও সম্পদগুলো একটি জাতির মধ্যে সুষম বন্টন করার কৌশল হলো রাজনীতি।

লেখক: এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ – সম্পাদক, ‘ক্রাইম প্রতিদিন‘। প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ‘অপরাধ মুক্ত বাংলাদেশ চাই‘।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন