Home / এক্সক্লুসিভ / ২০ ঘণ্টা দাঁড়িয়েও মিলছে না ট্রেনের টিকিট

২০ ঘণ্টা দাঁড়িয়েও মিলছে না ট্রেনের টিকিট

ক্রাইম প্রতিদিন, ডেস্ক : ঈদ উপলক্ষে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রিতে ব্যাপক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। টিকিট কাটতে গিয়ে সাধারণ যাত্রীদের চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। অনেকে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত টিকিট পাচ্ছে না।

শুধু কাউন্টারেই নয়, অ্যাপসে টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রেও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে। টিকিট বিক্রিতে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি বা টিকিট কালোবাজারি হচ্ছে কিনা তা সরেজমিন দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি টিম বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কমলাপুর স্টেশনে অবস্থান করে।

এদিকে, টিকিট বিক্রিতে অব্যবস্থাপনার জন্য যাত্রীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন রেলপথমন্ত্রী। ৩১ মে’র অগ্রিম টিকিট বুধবার বিক্রি করা হয়েছে। ১ জুনের অগ্রিম টিকিট আজ বিক্রি করা হবে।

সকাল ১০টায় কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন করেন রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন। এ সময় কাউন্টার থেকে কাঙ্ক্ষিত টিকিট না পাওয়া যাত্রীদের অভিযোগ শোনেন তিনি।

এরপর সাংবাদিকদের তিনি জানান, অগ্রিম টিকিট কাটতে আসা যাত্রীদের চাপ অনেক বেশি। সীমিত টিকিট থাকায় কাঙ্ক্ষিত টিকিট সবাইকে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া নির্ধারিত টিকিট শেষ হয়ে গেলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কিছুই করার থাকে না। কেউ টিকিট না পেলে এবং অ্যাপসে প্রবেশ করেও টিকিট কাটতে না পারা যাত্রীদের ক্ষোভ-অভিযোগ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

তবে যাত্রীরা কাঙ্ক্ষিত টিকিট না পাওয়া ও সিএনএসবিডি কর্তৃক অ্যাপসের ধীরগতি ও বিড়ম্বনায় নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন রেলপথমন্ত্রী।

তিনি বলেন, অ্যাপসটি নতুন করা হয়েছে। এটি পরীক্ষামূলক অ্যাপস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ধীরগতি হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, টিকিট বিক্রির ব্যর্থতার দায় আমরা এড়াতে পারি না। সিএনএস তাদের সার্ভিস ডেভেলপ করার চেষ্টা করছে। আশা করছি, এ সমস্যা দ্রুত সময়ের মধ্যেই সমাধান হবে। আর এটি না হলে তাদের সঙ্গে রেলের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার আমিনুল হক জুয়েল জানান, রাজধানীর পাঁচটি রেলওয়ে স্টেশনের কাউন্টার থেকে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ১২ হাজার ৭৪৫টি টিকিট বিক্রি হচ্ছে। কাউন্টার থেকে কোনো অবস্থাতেই টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই।

সকাল সাড়ে ৯টায় কমলাপুর স্টেশনে টিকিট বিক্রি ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা পরিদর্শনে যায় দুদকের একটি টিম। দুদকের সহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিমটি প্রায় ৪ ঘণ্টা স্টেশনে অবস্থান করে।

দুদকের উপ-পরিচালক মনিরুল ইসলাম জানান, যাত্রীদের অভিযোগ কাউন্টার থেকে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত টিকিট পাচ্ছেন না। অ্যাপসের মাধ্যমে টিকিট কাটার ভোগান্তির কথা বলেছেন অনেকে। আমরা সিএনএসের রুমও পরিদর্শন করেছি। বিলম্বের কারণ কি তাও জানতে চেয়েছি। কিন্তু কর্তব্যরত কর্মকর্তা বলেছেন, অ্যাপসটি নতুন। এতে প্রচণ্ড চাপ বাড়ছে। শত শত লোক একই সঙ্গে ঢোকার চেষ্টা করায় সার্ভার কিছুটা ডাউন হয়ে যাচ্ছে। এতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা সিএনএসবিডির কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছি।

পুরো বিষয়টি কমিশনকে জানাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, স্টেশনে আমাদের লোক থাকবে, সর্বদা নজরে রয়েছে টিকিট বিক্রি কার্যক্রম। কোনো অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি হলে কেউ রেহাই পাবে না। অ্যাপসের কার্যক্রমে ধীরগতি রয়েছে বলেও তিনি জানান।

সিএনএসবিডির কর্মকর্তা শামিম আহমেদ জানান, অ্যাপসের মাধ্যমে আমরা যথাযথ টিকিট বিক্রি করছি। তবে নতুন অ্যাপসটিতে চাপ বেশি থাকায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। টিকিট যথাযথই বিক্রি করা হচ্ছে। মোট টিকিটের মধ্যে অ্যাপসের মাধ্যমে ১১ হাজার ১৪৫টি টিকিট বিক্রি হয়। বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অ্যাপসের মাধ্যমে বিক্রি হয় আট হাজার ৭০০ টিকিট। অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশ টিকিট এ অ্যাপসের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ঈদের সময় এ অ্যাপসে একসঙ্গে প্রায় পৌনে দুই লাখ হিট পড়ছে। এতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। টিকিট বিক্রিতে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। স্বচ্ছতার জন্য বৃহস্পতিবার থেকে যাত্রীদের তথ্যসহ বিক্রীত টিকিটের পুরো লিস্ট রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। একটি মহল অ্যাপসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও তিনি জানান।

ঢাকায় পাঁচটি স্টেশনের কাউন্টার থেকে বুধবার দুপুর ২টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত ১০ হাজার ৫৪০টি টিকিট বিক্রি হয়েছে।

দিনাজপুরগামী যাত্রী জহিরুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় লাইনে দাঁড়িয়েও বুধবার তিনি একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের কেবিন কিংবা এসি চেয়ারের সিট কাটতে পারেননি। বাধ্য হয়ে শোভন চেয়ারের টিকিট কেটেছেন তিনি।

তিনি বলেন, লাইনের ২১ জনের পেছনে ছিলেন তিনি। পদ্মা এক্সপ্রেসে ট্রেনের টিকিট কাটতে আসা হ্যাপী জাহান জানান, তিনি তার ছোট ভাইকে নিয়ে সেহরি খেয়েই কমলাপুরে এসে লাইনে দাঁড়ান। অসুস্থ মাকে নিয়ে যাবেন। চারটি এসি টিকিট কাটতে এসেছিলেন। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি কোনো টিকিট কাটতে পারেননি। টিকিট না পেয়ে অনেককে স্টেশন ত্যাগ করতেও দেখা গেছে।

বুধবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ছাড়াও রাজধানীর বিমানবন্দর, তেজগাঁও, বনানী ও পুরাতন ফুলবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা হয়। পাঁচটি স্টেশনের ৩৬টি কাউন্টার থেকে ৩৩টি আন্তঃনগর ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা হয়। ঈদ স্পেশাল চারটি ট্রেনসহ ৩৭টি ট্রেনে ২৫ হাজার ৫৭১টি টিকিট প্রতিদিন বিক্রি করা হবে।

কমলাপুর থেকে ১২টি ট্রেনের টিকিট বিক্রি হয়। এছাড়া বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ৬টি ট্রেনের টিকিট বিক্রি হয়। তেজগাঁও রেলওয়ে স্টেশন থেকে ৪টি ট্রেনের টিকিট বিক্রি হয়। বনানী স্টেশন থেকে ২টি আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট বিক্রি হয় এবং পুরাতন ফুলবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে ৭টি আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট বিক্রি হয়। বুধবার এসব স্টেশনে ১২ হাজার ৭৪৫টি টিকিট বিক্রি হওয়ার কথা ছিল।

এ বিষয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার আমিনুল হক জুয়েল যুগান্তরকে জানান, কমলাপুরসহ রাজধানীর পাঁচটি স্টেশন থেকে বুধবার ১২ হাজার ৭৪৫টি টিকিট বিক্রি হওয়ার কথা ছিল। বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রায় ৯০ শতাংশ টিকিট বিক্রি হয়েছে।

তিনি বলেন, ট্রেনগুলোর কেবিন, এসি চেয়ার, শোভন চেয়ারের টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। শোভন সিটের কিছু সিট রয়েছে, যা চলতি কাউন্টার থেকে বিক্রি করা হবে। যে কেউ চলতি কাউন্টার থেকে এ টিকিটগুলো কাটতে পারবেন।

তিনি বলেন, কাউন্টার থেকে যথা নিয়মে টিকিট বিক্রি হচ্ছে, কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। সীমিত টিকিট থাকায় কাঙ্ক্ষিত টিকিট পাচ্ছেন না যাত্রীরা। টিকিটের বিপরীতে দুই থেকে তিনগুণ যাত্রী লাইনে দাঁড়ালে সবাইতো টিকিট পাবেন না, এটাই স্বাভাবিক।

আজ ১ জুনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি : আজ ১ জুনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা হবে। ২৪ মে ২ জুনের, ২৫ মে ৩ জুনের এবং ২৬ মে ৪ জুনের অগ্রিম টিকিটি বিক্রি করা হবে। কমলাপুর স্টেশন থেকে রাজশাহী, খুলনা ও পঞ্চগড়, চিলাহাটি, রংপুর, লালমনিরহাট, সিরাগঞ্জ ও ঈশ্বরদীগামী আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট বিক্রি হচ্ছে। বিমানবন্দর স্টেশন থেকে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীগামী আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে।

তেজগাঁও স্টেশন থেকে তারাকান্দি/দেওয়ানগঞ্জ ও জামালপুরগামী ট্রেনের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। বনানী স্টেশন থেকে নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জের টিকিট এবং পুরাতন ফুলবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে সিলেট ও কিশোরগঞ্জগামী আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন : বুধবার সকাল ৯টা থেকে চট্টগ্রাম স্টেশনেও অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়। তবে প্রথম দিনে অগ্রিম টিকিট নিতে যাত্রীদের তেমন ভিড় ছিল না। এরপরও যারা টিকিট পেয়েছেন তাদের খুশির অন্ত ছিল না। কাউন্টারের সমপরিমাণ ঈদের অগ্রিম টিকিট অনলাইনেও ছাড়া হয়। যদিও সার্ভারের ত্রুটির কারণে সকাল থেকে অনলাইনে টিকিট কাটতে পারেননি অনেক যাত্রী।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রথম দিনে কোটা ও ভিআইপি বাদ দিয়ে সাত হাজারের বেশি টিকিট ছাড়া হয়। এরমধ্যে অনলাইনেও ছাড়া হয় অর্ধেক টিকিট। দুপুর ১২টা পর্যন্ত কাউন্টারে অর্ধেক টিকিট বিক্রি হলেও বিকাল পর্যন্ত বেশ কিছু টিকিট অবিক্রীত থেকে যায়।

সকালে টিকিট বিক্রি কার্যক্রম সরেজমিন পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশ সুপার নওরোজ হাসান তালুকদারসহ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।-যুগান্তর