লকডাউন আর কতদিন?

  • আমীন আল রশীদ, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, রংধনু টেলিভিশন।
  • ২০২০-০৪-১৫ ২২:৪০:৩০
image

জাতিসংঘ বলছে, এ মুহূর্তে লকডাউন প্রত্যাহার করা হলে আরও প্রাণহানি হবে। গত ১১ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেদ্রোস আদহানম ঘেব্রেইয়েসুস সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিশ্বের দেশগুলো যদি সামাজিক দূরত্বের কড়াকড়ি খুব তাড়াতাড়ি তুলে নেয়, তাহলে করোনাভাইরাসের ভয়াবহ বিস্তার ঘটতে পারে। অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়লেও বিধিনিষেধ শিথিল করার ক্ষেত্রে দেশগুলোকে সতর্ক হতে হবে।

এ অবস্থায় ভারতে ৩ মে পর্যন্ত লকডাউন বাড়ানো হয়েছে। ফ্রান্স বাড়িয়েছে ১১ মে পর্যন্ত। তবে লকডাউন থাকলেও কিছুটা শিথিল করেছে ইতালি ও স্পেন। কিন্তু, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, তার দেশের অবস্থা এমন হয়েছে যে একদিকে ভাইরাস আরেক দিকে ক্ষুধা, উপায় কী! পাকিস্তান ধীরে ধীরে লকডাউন তুলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি কী? সরকারি খাদ্য সহায়তা বা ত্রাণের গাড়িতে ক্ষুধার্ত মানুষের হামলার সংবাদ এরইমধ্যে শিরোনাম হয়েছে— স্বাভাবিক হিসাবে যে পরিস্থিতি আরও কিছুদিন পরে তৈরি হওয়ার কথা ছিল। এরকম বাস্তবতায় যে প্রশ্নটি এখন সামনে আসছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও লোকজন বলাবলি শুরু করছেন যে, বাংলাদেশের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতি আর বিপুল জনগোষ্ঠীর দেশে ঠিক কতদিন লকডাউন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব?

দিনমজুর আর কর্মহীন মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে সরকার নানাবিধ উদ্যোগ নিলেও সেই সহায়তা অনেকে যেমন একাধিকবার পাচ্ছেন, তেমনি অনেকে মোটেও পাচ্ছেন না— এমন অভিযোগ উঠেছে। এখানে বণ্টনের সমস্যা যেমন আছে, তেমনি আছে দুর্নীতি ও লুটপাট; আছে অব্যবস্থাপনা। সুতরাং লকডাউন খুব বেশিদিন চালাতে গেলে প্রথম ধাক্কাটি আসবে এই দরিদ্র মানুষদের তরফে যাদের কাজ নেই, কাজ না থাকলে পয়সা নেই এবং যে কারণে ঘরে খাবার নেই।

প্রায় ১৭ কোটি লোকের দেশে এই সংখ্যাটিও কম নয়। সুতরাং করোনাভাইরাস মোকাবেলায় আরও কতদিন লকডাউন চালিয়ে নেওয়া হবে এবং এটি প্রত্যাহার করলে কী পরিমাণ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে— তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

আমাদের দেশে লকডাউন নিয়ে শুরু থেকেই কিছু বিভ্রান্তি ছিল। সেই বিভ্রান্তি এড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মার্চের মাঝামাঝি দুই সপ্তাহের জন্য পূর্ণাঙ্গ লকডাউন ঘোষণা করা হলে এতদিনে বোধ হয় দেশ করোনার ঝুঁকিমুক্ত হতো এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসতো।

কিন্তু, হয়তো মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত সরকারের নীতিনির্ধারকরা অতি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন (কিছু ভুল বার্তাও হয়তো তাদের কাছে ছিল) অথবা সারা দেশে দুই সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক লকডাউন ঘোষণায় কোনো ‘টেনকিন্যাল’ কারণ ছিল। যে কারণে সরকারের তরফে এখন পর্যন্ত ‘লকডাউন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। বরং বারবারই বলা হচ্ছে সাধারণ ছুটি।

ছুটি আর লকডাউনের চরিত্রগত পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য যতটা না অ্যাকাডেমিক, তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক। কারণ ছুটি শব্দটি হালকাচালের। যা মানুষের মনে ভয়ের পরিবর্তে আনন্দের উদ্রেক ঘটায়। ফলে সাধারণ ছুটি পেয়ে মানুষ দলে দলে ঢাকা ছাড়লো এবং করোনা মোকাবেলার সবচেয়ে বড় উপায় যে ‘ফিজিক্যাল ডিসট্যান্স’ বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা— সেটি ভেঙে পড়লো।

রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় লোকজন বাইরে জড়ো হতে ভয় পেলেও গ্রামগঞ্জের চেহারা একেবারেই আলাদা। আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন ঘোষিত এলাকা বা গ্রাম ছাড়া অন্য কোথাও মানুষ এসব পাত্তা দিচ্ছে না। আবার বিদেশ থেকে করোনার ঝুঁকি নিয়ে যারা এসেছেন, তাদের একটা বড় অংশই গ্রামে চলে গেছেন পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে। কিন্তু, তাদের মধ্যে করোনার জীবাণু বহন করছেন এবং কত শত বা কত হাজার লোককে তারা সংক্রমিত করেছেন, তা জানা মুশকিল।

প্রকৃত চিত্র জানতে হয়তো আমাদের আরও অনেকটা সময় লাগবে অথবা কোনোদিনই জানা যাবে না। তার মানে যে বিপদটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল, সেটিকে জেনে-বুঝে আমরা নিজেদের মধ্যে ছড়িয়ে দিলাম।

এখন কথা হচ্ছে, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশটি কতদিন অচল হয়ে থাকবে? বিশেষ করে দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয় যেসব খাতকে, সেগুলো কতদিন বন্ধ রাখা সম্ভব? সরকার কতদিন গরিব মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেবে? সবাই তো সেই সহায়তা পাবেও না। আবার বেসরকারি চাকরিজীবী যারা মূলত বেতননির্ভর— বেশিদিন লকডাউন থাকলে তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে— তারা চাকিরি হারাবে। কর্মীরা বেকার হবেন। তারা কার কাছে হাত পাববেন? সুতরাং শুধু দরিদ্র মানুষ নয়, এই বেসরকারি চাকরিজীবী শ্রেণির জন্যও খুব বেশিদিন লকডাউন বাস্তবসম্মত নয়।

কিন্তু, ঠিক কখন এই লকডাউন প্রত্যাহার করা হবে এবং তাতে কত সংখ্যক মানুষ করোনার ঝুঁকিতে পড়বেন— সেটিও মাথায় রাখা দরকার। অর্থাৎ একদিকে মহামারিতে মৃত্যু, অন্যদিকে খাদ্য সংকট ও বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশের অর্থনীতি রক্ষা— সব মিলিয়ে করোনাভাইরাস মূলত ‘শাঁখের করাত’। এ থেকে উত্তরণ খুব সহজ হবে না। এখানে খুব শক্তিশালী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লাগবে। একদিকে মানবিকতা, সংবেদনশীলতা এবং অন্যদিকে দেশ বাঁচানো। মানুষ বাঁচলে দেশ বাঁচবে, আবার দেশ বিপদে পড়লে মানুষের জীবনও বিপন্ন হবে। আমরা কোনদিকে যাব? এক কথায় উত্তর দেওয়া কঠিন।

ফ্রান্সের মতো ধনী দেশগুলো অর্থনৈতিক সংকটে যতটা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, আমরা কি তা পারব? আমাদের কৃষককে তো বাঁচাতে হবে। সেই কৃষকের অধিকাংশই থাকেন গ্রামাঞ্চলে— যেখানে লকডাউন সবচেয়ে বেশি শিথিল এবং যেখানে করোনার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কৃষক না বাঁচলে দেশে দুর্ভিক্ষ হবে।

করোনাভাইরাস পুরো বিশ্বকে এখন খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। যে, যিনি বা যার পরিবারের কোনো সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তার প্রশ্নটি বাঁচা-মরার। আর যে মানুষ করোনায় আক্রান্ত হননি, কিন্তু দুয়ারে ‘ক্ষুধার ঠাকুর’ দাঁড়িয়ে আছেন— এরকম মানুষের সংখ্যাও অনেক। রাষ্ট্র কার কথা শুনবে?

লকডাউন বিষয়ে একদল মার্কিন গবেষকের প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হচ্ছে, কোনো দেশ যদি তিন সপ্তাহ কঠোর লকডাউন মান্য করে তবে এই মহামারি কিছুটা সংযত করা সম্ভব। আর চার সপ্তাহ মানে এক মাস লকডাউন চালিয়ে গেলে এই মহামারি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। আর ছয় সপ্তাহ লকডাউন হলে কোনো দেশ পুরোপুরি এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের মতো দেশে সর্বোচ্চ কতদিন লকডাউন বাস্তবসম্মত এবং ধীরে ধীরে অর্থনীতির লাইফলাইনগুলো কীভাবে সচল করা যাবে, তার মেকানিজম বের করা জরুরি।

আমরা যে বিপদ নিজেরা ডেকে এনেছি বা শুরু থেকেই অধিকতর সতর্ক থাকলে যে বিপদটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যেতো, সেই বিপদে কিছু মানুষের যে প্রাণহানি হবে, অসংখ্য মানুষ যে আক্রান্ত হবে এবং তার মধ্যে একটা বড় অংশ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠবে— এটিই বাস্তবতা। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই এখন আমাদের ভাবতে হবে, আগামী ২৫ এপ্রিলের পরে লকডাউনের চেহারাটা আসলে কেমন হবে? এভাবেই চলবে নাকি এখানে কিছু শিথিল করা হবে? আবার শিথিলের ঘোষণা দেওয়া হলে মানুষ কি সেটি মানবে নাকি বাঁধ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসবে? ফলে এই চ্যালেঞ্জে শঙ্কাও আছে। তাতে নতুন করে কোটি মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়বে। ফলে চট করে এই সমস্যার সমাধান বের করা যাবে না।

সিনিয়র সাংবাদিক সানাউল্লাহ লাবলু ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বিমানবন্দর, রেল বা বাস স্টেশন কতদিন বন্ধ থাকবে? মানুষের চলাচল কতদিন আটকে রাখা যাবে? দরজাটা তো খুলতেই হবে।’ উত্তরটাও তিনি দিয়েছেন, বারবার হাত ধুয়ে, সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করেই করোনাভাইরাসকে আমরা হারিয়ে দিতে পারি। সবাই সচেতন হয়ে সংক্রমণটা থামিয়ে দিতে পারি।’

নিউজটি শেয়ার করুন


নিউজ সম্পর্কে মতামত লিখুন


 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ