বিপদে পুরান ঢাকা

  • ক্রাইম প্রতিদিন ডেস্ক
  • ২০২০-০৪-১৯ ১৬:৪৬:৩৫
ক্রাইম প্রতিদিন

শক্তিশালী পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন পুরান ঢাকার ঐতিহ্য। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে এই ঐতিহ্যই বিপদ ডেকে আনছে অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকায়। এখানে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। ফলে অবিশ্বাস্য হারে বাড়ছে সংক্রমণ।

পুরান ঢাকার আটটি থানা এলাকার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত শুক্রবার পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২০ জন, যা সারাদেশের হিসাবে প্রায় ২৭ শতাংশ। শনাক্তের সংখ্যাও দ্রুত বেড়ে ২০১ জনে দাঁড়িয়েছে, যা ঢাকা মহানগরীর হিসাবে ২৭ শতাংশ। ওয়ারী, চকবাজার, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, কোতোয়ালি, লালবাগ, বংশাল এবং হাজারীবাগ- পুরান ঢাকার এই আট থানার সবগুলোই ঘনবসতিপূর্ণ। এসব এলাকার মানুষকে ঘরে আটকে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ প্রশাসনের জন্য। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) কাছেও মাথাব্যথার বড় কারণ পুরান ঢাকা।

আট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) সঙ্গে কথা বলে গত শুক্রবার পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। গত ১২ এপ্রিল পর্যন্ত পুরান ঢাকার ২৩ এলাকায় আটজনের মৃত্যু এবং ৮০ জন শনাক্ত হয়েছিল। পাঁচ দিনের ব্যবধানে সংক্রমণ প্রায় দ্বিগুণ ছড়িয়েছে। করোনার কবলে পড়েছে ৪৪ এলাকা। মৃত্যু এবং শনাক্তও বেড়েছে আড়াই গুণ।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় পুরান ঢাকা তাদের কাছে বাড়তি মাথাব্যথার কারণ। এখানকার বাসিন্দাদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, পুরান ঢাকার মানুষের মধ্যে বন্ধন অনেক শক্তিশালী। এটি তাদের ঐতিহ্য। ফলে বর্তমান অবস্থার মধ্যেও তারা একে অন্যের বাসায় বেড়াতে যাচ্ছেন। রাস্তাঘাটে অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরা করছেন। তারা বুঝতেই চান না যে, এ পরিস্থিতিতে সবার ঘরে থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পুরান ঢাকায় করোনা সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করাসহ নতুন পরিকল্পনা নেওয়ার কথাও জানান আইইডিসিআর পরিচালক।

পুলিশের ওয়ারী জোনের উপ-কমিশনার হান্নানুল ইসলাম বলেন, পুরান ঢাকায় মৃত্যুর সংখ্যা খুবই উদ্বেগজনক। অনেক শিক্ষিত মানুষও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা মানছেন না।

সূত্রাপুর মিল ব্যারাক থেকে হাজারীবাগ ট্যানারি মোড় এবং সদরঘাট থেকে নবাবপুর পর্যন্ত বিস্তৃত পুরান ঢাকায় নানা রকমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কাপড়ের দোকান থেকে হার্ডওয়্যার, টুলস, ইলেকট্রনিকসহ বিভিন্ন পণ্যের পাইকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ঘিরে বিপুল সংখ্যক মানুষের বসতি। সংকীর্ণ অলিগলির দুই পাশে অল্প জায়গার ওপর অনেক বাড়িঘর। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্নিষ্টরা।

গলদঘর্ম প্রশাসন : সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সংক্রমণ এড়াতে পুরান ঢাকায় এরই মধ্যে তিন শতাধিক বাড়ি ও গলি লকডাউন করা হয়েছে। মানুষকে বুঝিয়ে ঘরে ঢোকানো হচ্ছে। কিন্তু একটু পর তারা আবার বেরিয়ে আসে।

সূত্রাপুর থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী বলেন, গত বৃহস্পতিবার হূষীকেশ দাস লেনে সাড়ে চার বছরের এক শিশুর করোনা শনাক্ত হয়েছে। তার বাবা একজন স্কুলশিক্ষক। এই পরিস্থিতিতেও তারা ওয়ারীতে এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যায়। সেখান থেকে ফিরে ওই শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। একজন স্কুলশিক্ষক এমন অসচেতন হলে কিছু বলার থাকে না।

বংশাল থানার ওসি শাহীন ফকির বলেন, রাস্তাঘাটে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। নিম্ন আয়ের লোকজনকে কোনোভাবেই বোঝানো যাচ্ছে না। মাইকিং করে তাদের নানা নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। মানছে খুব কম মানুষ।

লালবাগ থানার ওসি কে এম আশরাফ উদ্দিন বলেন, ছোট্ট ঝুপড়িঘরে ১৫ জন পর্যন্ত বাস করে। এই গরমের মধ্যে সারাদিন ঘরে থাকাও কষ্টকর। কিন্তু তারা যেভাবে রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেটি আরও বিপদের কারণ।

ওয়ারী থানার ওসি আজিজুল হক বলেন, একজন অসচেতন মানুষের কারণে পুরো ওয়ারীতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে বিদেশফেরত মানুষের সংখ্যা বেশি। সেটিও ঝুঁকির কারণ হতে পারে। ওয়ারীতে রাস্তাঘাটে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা হচ্ছে ঠিকই, আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানো বন্ধ হয়নি।

কোতোয়ালি থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় কোতোয়ালি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিভিন্ন দোকানপাট বন্ধ থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দারা নানা কারণে রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করছে।

গেন্ডারিয়া থানার ওসি সাজু মিয়া বলেন, স্বামীবাগ ঔষধাগারের বিপরীতে এবং আসগর আলী হাসপাতালের পাশের গলিতে দু'জন মারা গেছেন। বিভিন্ন গলি লকডাউন করা হলেও অনেকে মানছেন না।

হাজারীবাগ থানার ওসি ইকরাম আলী মিয়া বলেন, এখানে নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি। বেশিরভাগ মানুষ ত্রাণ নিতে রাস্তায় ঘুরছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মানুষকে বোঝানো সম্ভব হচ্ছে না।

কোথায় কত শনাক্ত : আইইডিসিআরের তথ্যমতে, গত ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীতে মোট শনাক্তের সংখ্যা ৭৪০ জন। এদের ২০১ জনই পুরান ঢাকার আট থানাধীন। ওয়ারীতে ৩৪, গেন্ডারিয়ায় ১৫, সূত্রাপুরে ১৫, কোতোয়ালিতে ৪২, বংশালে ২৪, চকবাজারে ২০, লালবাগে ৩৩ এবং হাজারীবাগে ১৮ জন। এ ছাড়া নিকটস্থ যাত্রাবাড়ীতে শনাক্ত হয়েছে ২৮ জন।

অবশ্য আইইডিসিআর এবং সংশ্নিষ্ট থানাগুলোর মধ্যে তথ্যগত গরমিল রয়েছে। এর কারণ হিসেবে কয়েকটি থানার ওসির ভাষ্য, আইইডিসিআর থেকে দেওয়া রোগীর ঠিকানায় অনেককে পাওয়া যায় না।

 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ