ঢাকার রাস্তায় ওরা কারা!

  • ক্রাইম প্রতিদিন ডেস্ক
  • ২০২০-০৫-০৯ ১৫:৫৩:৩৫
image

দেশে প্রতিদিন করোনাভাইরাস সংক্রমনের সংখ্যা বাড়ছে। সামাজিক ট্রান্সমিশন ঠেকাতে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ‘সামাজিক দূরত্ব’ রক্ষার উপর জোর দিয়েছেন। সরকারি ছুটি, গণপরিবহন বন্ধ এবং লকডাউনের মধ্যে সরকার মানুষকে ‘ঘরে থাকা’র পরামর্শ দিচ্ছেন। 

কিন্তু প্রতিদিন রাজধানী ঢাকার মার্কেট, রাজপথ থেকে শুরু করে অলিগলিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ চোখে পড়ে। ঝুঁকি নিয়ে চলাফেরা এসব ব্যাক্তি সর্বত্রই করোনা ঝুঁকি ছড়াচ্ছেন। কারণে-অকারণে কেউ রাস্তায় নামছেন, কেউ ফুটপাথের চা দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছেন, কেউ অযথাই কেনাকাটার নাম করে রাস্তায় চলাফেরা করছেন, কেউ বা ফাঁকা মহানগর পেয়ে প্রাইভেট কার নিয়ে বেড়িয়ে পড়ছেন।

ট্রাফিক পুলিশ ও আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা মোড়ে মোড়ে যখন মানুষ ও যানবাহন থামিয়ে রাস্তায় নামার কারণ জানতে চাচ্ছেন; তখন বেশির ভাগ মানুষই ঠুনকো হাস্যকর অজুহাত দেখাচ্ছেন। করোনার সংক্রমন নিয়ন্ত্রনে সবাই যখন ঘরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। তখন কারণে-অকারণে প্রতিদিন যারা রাস্তায় নামছেন তারা আসলে কারা? বিবেক বিবর্জিত মানুষগুলোর পরিচয় কি।

জানতে চাইলে চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, করোনার সামাজিক ট্রান্সমিশন ঠেকানো সামাজিক দূরত্ব রক্ষা আবশ্যক। দুঃখজনক হলো কিছু মানুষ বিবেকহীনের মতো অহেতুক ঘোরাফেরা করেন। এতে সংক্রমন আরো ছড়িয়ে পড়ছে। জাতির বৃহৎ স্বার্থে সরকারের উচিত লকডাউন কঠোরভাবে কার্যকর করা। 

দেশে করোনা সংক্রমনের দুই মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল শুক্রবার। এই দীর্ঘ সময়ে পর্যবেক্ষণ করে এবং খোঁজ-খবর নিয়ে যে চিত্র পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, ঢাকা শহরের বিপুল সংখ্যক তথা দুই তৃতীয়াংশ মানুষ ঘরবন্দি। এদের কেউ কেউ অতি প্রয়োজনে দু’এক ঘণ্টার জন্য বের হলেও নিজেকে নিরাপদ রেখেই চলাফেরা করেন। আর বেশির ভাগ মানুষ কার্যত বের হন না। ইট-পাথরের ঢাকা শহরে লাখ লাখ মানুষ উচু বিল্ডিংয়ে ফ্ল্যাটে থাকেন। তাদের অধিকাংশই প্রতিদিন আকাশ-বাতাস দেখলেও দুই মাস থেকে মাটির দেখেন না। এমনকি অনেকেই আকাশও দেখতে পান না দুই মাস ধরে। 

কর্মজীবনে দুই এবং তিনটি অফিস করতে হয় এবং প্রতিদিন সকাল ৯টায় ঘর থেকে বের হয়ে গভীর রাতে ফিরতে হয় কাজের চাপে। এমন ব্যস্ত মানুষও করোনার কারণে ঘরে বসে কাজকর্ম সারছেন। করোনা সংক্রমন ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় ঘরে অবস্থান তারা মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতিমাসে দুই তিন বার বিদেশ যেতেন এমন ব্যস্ত ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের বেশির ভাগ মানুষ করোনার কারণে স্বেচ্ছা ঘরবন্দি। বন্ধু-বান্ধব এবং নেতাকর্মী ও সহকর্মীদের ছাড়া যারা সকালের নাস্তা করতেন না; তারাও করোনায় এত ঘরে থেকে সময় কাটান। ফোনে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। এই যখন অবস্থা তখন এক শ্রেণির মানুষ করোনার ঝঁকির মধ্যেই প্রতিদিন রাস্তায় নামছেন।

বাস-ট্রেন-হোটেলের দেয়ালে দেখা যায় ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’। প্রবাদটির যথার্থতা করোনাকালে যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। করোনা সংক্রমন ঠেকাতে মিডিয়াকর্মীদের বড় অংশ ঘরে বসেই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তারপরও পেশাগত কারণে প্রায়ই বাইরে বের হলে দেখা যায় রাস্তায়, কাঁচাবাজার, ত্রাণ বিতরণের লাইনে একই শ্রেণির মানুষ। কাঁচাবাজারে প্রতিদিন কেনাকাটা করছেন, ভিড় করছেন ওই শ্রেণির মানুষ। তারা ছোট্টখাট পণ্য ক্রয়ের জন্যই দিনে একধিকবার বাজারে যাচ্ছেন লকডাউন ভেঙে। রাস্তায় রিকশায় ঘুরছেন, ভ্যান-অটো-সিএনজিতে এখান-সেখানে যাচ্ছেন ওই একই শ্রেণির মানুষ। 

রাস্তায় পুলিশ জিজ্ঞাস করলে কেউ আমতা আমতা করেন, কেউবা হাজারো প্রয়োজনের ফিরিস্তি দেন। ঢাকা শহরের প্রতিটি ত্রাণ কার্যত টিভির ক্যামেরা নির্ভর। সেখানে তাকালে দেখা যায় একই মুখগুলো ত্রাণের জন্য বার বার লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। এক যায়গায় ত্রাণ নিয়ে অদূরে অন্য যায়গায় গিয়ে ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছেন। ত্রাণের জন্য রাস্তার ফুটপাথে বসে ঘন্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন; আবার মার্কেট-দোকানে এবং কোথাও কাউকে দেখলেই সাহার্য্যরে জন্য হাত পাতছেন; এই মুখগুলো কার্যত অভিন্ন। একই মানুষ বিভিন্নভাবে রাস্তায় নামছেন, সামাজিক দূরত্ব ভেঙে জাতিকে করোনা ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছেন। 

বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মনে করছেন শপিংমল ও বিপতিবিতান খোলা হলে করোনার সামাজক ট্রান্সমিশন ব্যপকভাবে বেড়ে যাবে। ক্রেতা-বিক্রেতা সামাজিক দূরত্ব রক্ষা যেমন দূরহ তেমনি একই কাপড় কয়েকজন ক্রেতা উল্টে পাল্টে দেখবেন। তাদের বক্তব্য বেঁচে থাকলে জীবনে অনেক ঈদ আসবে। জীবনই যদি না থাকে তাহলে টাকা দিয়ে কি হবে। দোকান খুললে কোনোভাবেই ক্রেতাদের নিয়ে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে না। এতে দোকান মালিক, কর্মচারী, ক্রেতা সকলেই মধ্যে সংক্রমন ছড়িয়ে পড়বে। 

১০ মে শপিংমল ও মার্কেট খোলার ব্যাখ্যা দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি বলেছেন, দোকান মালিক সমিতির সভাপতির চিঠি পেয়েই ১০ মে দোকানপাট খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে এক টেলিভিশনে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলালউদ্দিন বলেছেন, বাণিজ্য সচিবের চিঠি পাওয়ার পর মার্কেট খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যারা মার্কেট খোলা রাখতে পারবেন তারা খুলবেন। সরকারের ভিতরের কিছু ব্যাক্তির ঈদের আগে শপিংমল ও বিপনি বিতান খুলে দেয়ার তাগাদার রহস্য কি?

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশে ঈদের বাজারে ভারতীয় কাপড় বিক্রি করার তাগাদা থেকে ঝুঁকি নিয়েই মার্কেট খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এবার করোনার কারণে চীন থেকে কোনো কাপড় বাংলাদেশে আসেনি। ঈদের মার্কেট ধরতে ভারত থেকে বিপুল পরিমান কাপড় বৈধ-অবৈধ পথে এসেছে। সে কাপড় বিক্রির তাগাদা থেকেই মার্কেট খুলে দেয়ার আগ্রহ। 

ভারতীয় পণ্যের বাজার ধরতে এদেশের কারো কারো কাছে যেন মানুষের জীবনের মূল্য গৌণ হয়ে গেছে। করোনাভাইরাসের থাবায় গোটা বিশ্ব যখন পর্যুদস্ত তখনো ভারতীয় কাপড় বিক্রি করতে বাংলাদেশের কিছু মানুষ অস্থির। ভারতের স্বার্থ রক্ষার কাছে এদেশের মানুষের করোনায় মৃত্যু ঝুঁকি যেন কিছুই নয়। তবে ব্যবসায়ীদের বড় একটা অংশ করোনাকালে ঘরে বসে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। 

নিউজটি শেয়ার করুন


নিউজ সম্পর্কে মতামত লিখুন


 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ