সচিবের মৃত্যু নিয়ে কুর্মিটোলার ডাক্তারের আবেগঘন স্ট্যাটাস

  • ডা. শাহজাদ হোসেন মাসুম (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)
  • ২০২০-০৫-১২ ১৪:২১:৪২
ক্রাইম প্রতিদিন

ব্যক্তিগত কারণে কিছুটা স্ট্রেসড সময় পার করছি। কথা বলার ইচ্ছা কমে গেছে। তাছাড়া আগে থেকেই অভিযোগের উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ তা অর্থহীন। কোন লাভ হয় না। সবাই সবকিছু নিজের মতই বিশ্বাস করেন। তবু কয়েকটা কথা বলতেই হচ্ছে। কারণ আমি নিজেই সরাসরি ব্যাপারটায় জড়িত।

দুইদিন থেকে একটি খবর নেটে ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই আমাকে ইনবক্স করেছেন, নিজের টাইমলাইনে বন্ধুরাও শেয়ার করছেন। খবরটি সর্বতোভাবে সত্যি হলে আসলেই সেটা খুবই আপত্তিজনক।

সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যিনি দীর্ঘদিন থেকে কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন, জটিলতা দেখা দিলে তিনি এই সময়ে চেষ্টা করেও হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হতে পারেননি। সর্বশেষ কুর্মিটোলায় ভর্তি হন এবং আইসিইউতে না নেওয়ার কারণে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার কন্যা একজন সরকারি চিকিৎসক। একজন চিকিৎসকের পিতা এবং একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মৃত্যুতে আমি আন্তরিকভাবে সমব্যথী। জীবনে এইটুকু অর্জন সহজে তিনি করতে পারেননি। রাষ্ট্রের কাছে তার প্রত্যাশা এবং প্রাপ্যতা অন্যদের থেকে বেশি।

অন্য হাসপাতালগুলোর কথা আমি জানি না। আমি কুর্মিটোলার ব্যাপারে দুয়েকটি কথা বলতে চাই। গভীর রাতে তিনি কুর্মিটোলা হাসপাতালে পজিটিভ রোগী হিসাবে ভর্তি হন। কেবিন খালি না থাকায় তাকে প্রথমে ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেই রাত্রেই পরিচালক মহোদয় প্রাধিকারের কারণে প্রথম খালি কেবিনে তাকে শিফট করার ব্যবস্থা করেন। পরদিন সন্ধ্যায় তার কন্যার কাছ থেকে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে তার কোভিড টেষ্ট করা হয়নি। পরদিন সকালে তার স্যাম্পল সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানো হয়। সেদিন ছিল শুক্রবার।

সেদিন সন্ধ্যায় রাউন্ডের সময় মেডিসিন কনসালট্যান্ট সিদ্ধান্ত নেন তাকে আইসিইউতে শিফট করা প্রয়োজন। তিনি তার কন্যাকে এটি জানান। এবং আইসিইউতে কল পাঠান। একই সময় ওয়ার্ড থেকে একজন সাধারণ রোগির জন্য আইসিইউতে কল আসে যার অবস্থা খুব খারাপ। আইসিইউতে তখন আর মাত্র একটি বেড খালি আছে। আইসিইউর এম ও আমাকে দুটি রোগী সম্পর্কেই বিস্তারিত জানান। আমি সিদ্ধান্ত নেই ওয়ার্ডের রোগীকে নেওয়ার জন্য এবং প্রথম বেড খালি হওয়ার সাথে সাথে কেবিনের রোগীকে নেওয়ার জন্য। পাঁচ মিনিটের মাঝেই এম ও আমাকে আবার ফোন করে জানান, স্যার মেডিসিনের কনসালট্যান্ট জানিয়েছেন কেবিনের রোগীকেই নিতে, উনি একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আমি পরিস্থিতি বিবেচনা করি। এবং মেডিসিনের কনসাল্ট্যান্টকে জানাই সিদ্ধান্ত তাকে নেওয়ার জন্য, যেকোন একজনকে সিলেক্ট করার জন্য। আমরা যেকোন একজনকেই নিব। আমরা অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষণ পর তিনি জানান, কেবিনের রোগী আইসিইউতে শিফট হতে রাজি নন। তারা টেষ্টের রিপোর্ট দেখে সিদ্ধান্ত নিবেন। কারণ আইসিইউর সব রোগী পজিটিভ। রোগীর কন্যা রিস্কবন্ড সই করেছেন (যা রোগীর ফাইলে এখনো সংরক্ষিত আছে)। পরদিন সকালে পরিচালক মহোদয় তাকে ডায়ালাইসিসে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সেখানেও সব রোগী পজিটিভ হবার কারণে তাঁরা অপেক্ষার সিদ্ধান্ত নেন। দুপুরে তার অবস্থার অবনতি হয় এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সেইসময় পরিচালক মহোদয় নিজেও কেবিন প্রিমিসিসে উপস্থিত ছিলেন। তাদের আরও কিছু অভিযোগ আছে, সেসব নিয়ে কিছু বলবো না, আগে অন্যখানে বলেছি।

প্রতিটি মৃত্যুই চিকিৎসকের পরাজয়, একটি পারিবারিক, মানবিক বিপর্যয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে বর্তমান সময়ে গভীরভাবে বিপর্যস্ত। আমার কাছে মনে হয় চলমান এই বিপর্যয়কে ঠেকানোর জন্য আমাদের একটা জিনিষেরই প্রয়োজন ছিল, একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। যা তৈরীর দায়িত্ব ডাক্তারদের হাতে কখনোই ছিল না। এই বিষয়ে আর কিছু বলবো না। শুধু একটা জিনিষ জানুন। এখন পর্যন্ত আমাদের কয়েকটি কোভিড এবং কয়েকটি ননকোভিড হাসপাতাল আছে। শুরু থেকেই মধ্যবর্তী রোগীরা হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে মারা যাচ্ছেন। এই রোগীর ক্ষেত্রেও শুরুতে তাই হয়েছে। আজও পর্যন্ত সাসপেক্টেড রোগীদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন ব্যবস্থা হয়নি। আপনারা দোষ ডাক্তারদের দিয়েই ফেসবুকের পরবর্তী ইভেন্টে ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন। সমস্যাটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

যান, অসুবিধা নেই। শুনেছি রাস্তায় রাস্তায় জ্যাম। বাজার জমজমাট। গতকাল আড়ংএর ম্যাসেজ পেলাম। জেনে রাখুন কোভিড হাসপাতালগুলো লড়াইএর শেষ সীমায় আছে। আমাদের চিকিৎসক নার্স ওয়ার্ডবয়রা নিজেদের ইনফেক্টেড হওয়া থামাতে পারছেন না। প্রতিটা হাসপাতাল রোগীর ভারের শেষ সীমায়। গতকালের নতুন ইনফেকশানের সংখ্যা দেখেছেন। আপনারাই বলেন এই সংখ্যাটা শুধু একটা ফ্র্যাকশান। এরপর আর গালিতে হবে না। লাঠি নিয়ে এসে ডাক্তার নার্স পিটিয়ে যাবেন। তবু যদি আর দশদিন পর হাসপাতালগুলো আপনাদের চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতায় থাকে। সারাজীবন শুধু অন্যের দোষ ধরে গেছেন নাগরিক হিসাবে নিজের দায়িত্ব পালনে চূড়ান্ত অনাগ্রহ। বাঙ্গালী লাইনে দাঁড়ালে মনে করে ইজ্জত শেষ। ফোন পেয়ে কেউ তাঁকে স্যার স্যার করে লাইন থেকে বের করে নিয়ে বিশেষ সার্ভিস দিবে, এই এ্যাটিচুড নিয়ে চলা বাঙ্গালির আজকে সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া সারাজীবনের সবচেয়ে বড় অপমান। এই অপমানের রিপার্কাশান খুব নীরব হবে না। আমরা যারা সরকারী হাসপাতালে কাজ করি এইসব আমরা জানি।

তবু সবার মঙ্গল কামনা করি। এনেসথেশিয়া যার কাছে শিখেছি, জীবনের নানা প্রয়োজনীয় দর্শন যার কাছ থেকে নিয়েছি সেই প্রিয়জন কোভিড পজিটিভ। তিনি প্রিয় শিক্ষক, প্রিয় ভাই, প্রিয় স্বজন। আল্লাহর কাছে তার জন্য প্রার্থনা করি। জানি না কখন নিজেরও এই সময় আসে। ভয় কি শুধু এই দেশে ডাক্তারদেরই!

 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ