করোনায় কাঁদছে চট্টগ্রাম : কিট, টেস্ট, চিকিৎসা, আইসিইউ সঙ্কটে বাড়ছে সংক্রমণ

  • ক্রাইম প্রতিদিন ডেস্ক
  • ২০২০-০৬-০৬ ১৩:৪৮:২৩
image

করোনা টেস্ট কিটের ঘাটতি। আসবে শিগগিরই। চবিতে নতুন ল্যাবে টেস্ট চালু হতেই হাজারো কিট ত্রুটিপূর্ণ। হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট আছে। তবে শয্যা সংখ্যা খুবই সীমিত। শয্যা বাড়ানো হবে। রোগীর চাপ বাড়ছে। চিকিৎসা অপ্রতুল।
আইসিইউ সুবিধার চরম সঙ্কট। বাড়বে আইসিইউ। ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী আছেন স্বল্পসংখ্যক। ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে। এভাবেই ‘আছে-নেই’ ‘ঘাটতি’ ‘ত্রুটি’ মিলিয়ে হাজারো সঙ্কটের জোড়াতালি সমাধানে ‘সারিয়ে’ নেয়ার এক ধরনের শোচনীয় ব্যর্থ চেষ্টা আর হতাশার প্রতিফলন ঘটছে চট্টগ্রামে করোনাভাইরাস মহামারী চিকিৎসার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায়।

গত ৩ এপ্রিল নগরীর দামপাড়ায় প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের দিন থেকে গত দুই মাসেরও বেশি পার হলো। স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমস্যা-সঙ্কট ‘শিগগির’ নিরসনে আশার বাণীর শুধুই ফুলঝুরি শুনিয়ে আসছে চট্টগ্রামবাসীকে।

করোনায় কাঁদছে চট্টগ্রাম। সবখানে ক্ষোভ-হতাশা, শঙ্কা-উৎকণ্ঠা আর জনমনে অসন্তোষ। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। ৭০ লাখ নগরবাসীর সঙ্গে জেলা চট্টগ্রামে অন্তত ৪৫ লাখ বাসিন্দা যোগ করে এক কোটিরও বেশি মানুষ। তারা এ মুহূর্তে করোনা চিকিৎসা এমনকি আদৌ টেস্ট করাই ‘ভাগ্যে’ জুটবে কিনা এ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা আর হতাশায় দিন গুজরান করছেন। চট্টগ্রামে স্বাস্থ্য বিভাগে নেই সমন্বয়, জবাবদিহিতা।

টেস্টের আশায় সকাল-সন্ধ্যা রোগীরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়েই হয়রান। শনাক্ত হচ্ছে নামেমাত্র। ধীরগতিতে। রিপোর্ট পেতে ৫/৭ দিন লেগে যাচ্ছে। চমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিট উপচে বারান্দায় গড়াগড়ি খাচ্ছে রোগী। ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম ও অসহায় অবস্থায় পড়েছেন। সম্মুখযোদ্ধারা আক্রান্ত হচ্ছেন প্রতিদিনই।

বন্দরনগরীতে বেসরকারি মানসম্মত হাসপাতাল রয়েছে এক ডজনেরও বেশি। তারা করোনা রোগীরদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেই দরজা বন্ধ করে রেখেছে। সরকারি নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। নেপথ্যে তৎপর একটি শক্তিশালী তথাকথিত সর্বদলীয় সিন্ডিকেট। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতাল এবং ইম্পেরিয়াল হাসপাতালকে করোনা ডেডিকেটেটেড ঘোষণা করে দ্রুত চিকিৎসা চালুর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা জনবল ঘাটতিসহ নানা অজুহাতে সরকারের নির্দেশ ঝুলিয়ে এমনকি অকার্যকর করেত উঠেপড়ে লেগেছে।

বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি নিশ্চিত করতে সরকার ৭ সদস্যের সার্ভিল্যান্স টিম গঠন করেছে। সার্বিকভাবে করোনা চিকিৎসায় হতাশা, ধীরে চলা ও নির্লিপ্ততায় সমগ্র চাটগাঁবাসীর প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের অভিযোগ উঠেছে সচেতন নাগরিক মহলের তরফ থেকে। অথচ চট্টগ্রামের বেশিরভাগই নেতা-এমপি এ বিষয়ে নির্বিকার।

আর এ অবস্থায় চট্টগ্রামে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনায় সংক্রমণ, মৃত্যুর সংখ্যা। উপসর্গে মৃত্যুহারও বাড়ছে। যার বড় একটি অংশই দেখা যাচ্ছে মৃত্যুর পর টেস্টে তারা করোনা রোগী হিসেবেই শনাক্ত হচ্ছেন।

চট্টগ্রামে সর্বশেষ আরও ১৩২ জনসহ এ যাবৎ দুই মাসে প্রায় পৌনে ৪ হাজার করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৮৯ জন। এ হিসাব চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন অফিসের। যদিও করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের দাফন ও সৎকার করা একমাত্র প্রতিষ্ঠান আল-মানাহিল ফাউন্ডেশন গত ৪ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামে মোট ১২৩ জনের দাফন ও সৎকার সম্পন্ন করেছে। পুলিশ প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটিকে করোনায় এসব মৃতের দাফন ও সৎকারের জন্য খবর দিয়ে থাকে। সে হিসাবে করোনায় মৃতদের বাড়তি সংখ্যা দাঁড়ায় আরও ৩০ শতাংশ।
চট্টগ্রামে করোনায় চিকিৎসা ব্যবস্থা চরম নাজুক। করোনা শনাক্ত হওয়া রোগীদের মাঝে প্রায় ১১ ভাগ হাসপাতালে ঠাঁই পাচ্ছেন। তাও অনেক ক্ষেত্রে তদবিরের জোরে। তদবির করছেন ভিআইপিরাও। অবশিষ্ট বিশাল সংখ্যক রোগী নিজ বাড়িঘরেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, চমেক হাসপাতাল, ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি এবং ফিল্ড হাসপাতালে প্রায় ৩২৫ জন করোনা রোগীর চিকিৎসা দেয়ার মতো শয্যা ও সুবিধা রয়েছে। এর বাইরে থেকে যাচ্ছে চট্টগ্রামের প্রায় ৮৯ শতাংশ রোগী। এসব হাসপাতালে এ মুহূর্তে একটি শয্যাও নেই খালি। হতাশ হয়েই ফিরছেন রোগীরা।

জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আবদুর রব মাসুম বলেছেন, টেস্টে শনাক্ত ও সংক্রমণ বৃদ্ধির সাথে সাথে রোগীর চাপ দিন দিন বেড়ে যাবে। এরজন্য নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট, শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, অর্ধশত আইসিইউ শয্যাসহ বিভিন্ন জরুরি ক্ষেত্রে চিকিৎসার সুবিধাগুলো বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

স্বাচিপ চট্টগ্রাম অঞ্চলের করোনা চিকিৎসা সমন্বয়কারী আ ন ম মিনহাজুর রহমান বলেন, আগামীতে সংক্রমণের হার বৃদ্ধির গতিতেই থাকবে। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই আমাদের যাবতীয় প্রস্ততি ঢেলে সাজাতে হবে।

চট্টগ্রামে করোনা শনাক্তে নমুনা টেস্ট চরম হয়রানি আর জনদুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। বিআইটিআইডি, সিভাসু, চমেক ল্যাব ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ল্যাবে টেস্ট হচ্ছে। সেখানে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা, নমুনা দেয়া, টেস্ট সম্পন্ন করা আর রিপোর্ট পেতে ৫ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম নাগরিক উদ্যোগের প্রধান উপদেষ্টা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, চট্টগ্রামে করোনা চিকিৎসায় একটা চরম অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা চলছে।

 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ