করোনা চিকিৎসার নামে লাখ টাকা ‘হাতিয়ে নিচ্ছে’ বেসরকারি হাসপাতাল

  • সারাবাংলা
  • ২০২০-০৬-০৭ ০৩:৪২:১৭
image

রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) চিকিৎসার নামে স্বেচ্ছাচারিতা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারিভাবে এই হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার কথা থাকলেও রোগীদের ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে লাখ টাকার বিল। রোগীকে অননুমোদিত ওষুধ দেওয়া থেকে শুরু করে নমুনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসার পরও হাসপাতালে রেখে বিল নেওয়ার হচ্ছে। বিল দিতে গিয়েও বিপত্তিতে পড়ছেন স্বজনরা। কোনো ব্যাংক চেক বা কার্ডে বিল নেওয়া হচ্ছে না, নগদ টাকায় বিল পরিশোধে স্বজনদের জিম্মি করা হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী স্বজনরা বলছেন, চিকিৎসা দেওয়ার নামে রীতিমতো ‘কসাইগিরি’ চালাচ্ছে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় সরকারি সহায়তা যথেষ্ট নয়। কোভিড-১৯ চিকিৎসায় সরকারের সঙ্গে চুক্তিও তারা বাতিল করেছে বলে জানিয়েছে। আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এভাবে রোগীকে জিম্মি করে টাকা নেওয়া অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

শিরিন ইসলাম (ছদ্মনাম) নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, আমার শ্বশুরের কোভিড-১৯ পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়ার পর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ভর্তি করাই। তার অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও প্রেশার ছিল। হাসপাতালে ভর্তির সময়েই আমাদের জানানো হয়, এখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়, শুধুমাত্র ওষুধের খরচ দিতে হবে। ভর্তির পরে তারা বাবাকে চিকিৎসা দেয়।  সেখানে আমাদের কারোর থাকার কোনো উপায় ছিল না। তাই আমরা বাসায় আইসোলেশনে ছিলাম। কিন্তু শ্বশুরেরও তেমন শারীরিক সমস্যা ছিল না হাসপাতালে। ঠান্ডাজনিত কারণে একটু গলা ভেঙে গিয়েছিল।

তিনি বলেন, ২৭ মে বাবা জানান, তার নমুনা নেওয়া হয়েছে, তিন দিন পরে ফল জানানো হবে। এর মধ্যে ৩০ মে সকালে বাবা ফোন দিয়ে জানান, তাকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। অথচ তার অক্সিজেন স্যাচুরেশন ছিল ৯৮ শতাংশ। চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরে জানানো হয়, অবস্থা যেন খারাপ না হয়, সে কারণে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে। ৩১ মে সকালে আমাদের জানানো হয়, বাবাকে রিলিজ দেওয়া হবে।

শিরিন ইসলাম বলেন, হাসপাতালে গিয়ে যা দেখি, তাতে সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। বাবার ২৭ মে যে নমুনা পরীক্ষা করা হয়, তার ফল ২৮ মে-ই চলে এসেছিল। অথচ ৩১ মে পর্যন্ত আমাদের সেটা জানানো হয়নি। ওই পরীক্ষায় নেগেটিভ রেজাল্ট আসার পরও ক্লেক্সেন ইঞ্জেকশন দেওয়াসহ চিকিৎসা দিয়ে যাওয়া হয়, যার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। আবার বিল দিতে গিয়েও বিপত্তি। এক লাখ ৫৮ হাজার ৬৭২ টাকার পুরোটাই ক্যাশে পেমেন্ট করতে হবে। একসঙ্গে তো কেউ এত টাকা রাখে না। আত্মীয়-স্বজনদের ফোন দিয়ে কোনোমতে টাকা জোগাড় করেছি। ওখানে আরও অনেকেই দেখলাম এরকম বিল দিতে গিয়ে ঝামেলায় পড়েছেন।

শিরিন অভিযাগ করে বলেন, বাবার অবস্থা তো মোটামুটি স্থিতিশীলই ছিল পুরোটা সময়। কিন্তু হাসপাতালের বিলের কপিতে দেখলাম ফ্যাভিপিরাভির ও ক্লেক্সেন ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়েছে। এই বাবদ বিল নেওয়া হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। এখানে তো আসলে সরকারিভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে এখানে আসলে কসাইগিরি করে রোগীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে আরেক ভুক্তভোগীর বিলের কপি থেকে দেখা যায়, কোভিড-১৯ সংক্রমিত হওয়ার পর ২৩ মে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। ২ জুন হাসপাতালের ছাড়পত্র দেওয়ার সময় তার বিল আসে এক লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ টাকা! এর মধ্যে হাসপাতালের বিল এক লাখ ১৪ হাজার ৫৭০ টাকা, চিকিৎসক বিল ১৮ হাজার ৭০০ টাকা, ইনভেস্টিগেশন বিল ১৯ হাজার ৪৭৫ টাকা, ওষুধের খরচ পাঁচ হাজার ২২৬ টাকা ৮৫ পয়সা। একইসঙ্গে সার্ভিস চার্জ হিসেবে নেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ৯০৩ টাকা। এই রোগীকে ফ্যাভিপিরাভির ওষুধও দেওয়া হয়।

ফকিরারপুলে একটি ছোট দোকান চালানো এই ভুক্তভোগী শারীরিক অসুস্থতার কারণে ভর্তি হন আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে। হাসপাতালের ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, আমাকে দুই লাখ ৬৮ হাজার টাকার বিলের কপি দিয়েছে এখান থেকে। এর আগেও আমি ৭৫ হাজার টাকা বিল দিয়েছি। আজকে এত টাকা আমি কোথা থেকে পাব?

সরকারিভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার কথা থাকলেও রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে টাকা। করোনার এই সংকটে এটা রোগীদের জিম্মি করার সমতুল্য কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের পরিচালক ( প্রশাসন) ডা. ইহতেশামুল হক বলেন, সরকারের সঙ্গে আমাদের একটি সমঝোতা চুক্তি ছিল। সেই অনুযায়ী আমরা আমাদের হাসপাতাল চালাতে পারছি না। সবকিছুর খরচ বেড়ে গেছে। চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয়দের বেশি টাকা না দিলে কাজ করতে চায় না। তার ওপর তাদের পরিবহন খরচও আমাদের বহন করতে হয়। এ অবস্থায় আসলে আমরা সরকারের সঙ্গে করা সমঝোতা চুক্তি বাতিল করেছি। ১ জুন থেকে আমাদের এখানে আর বিনামূল্যে চিকিৎসা হচ্ছে না।

কিন্তু ৩১ মে’র আগ পর্যন্তই রোগীদের কাছ থেকে বাড়তি বিল নেওয়া হয়েছে, কোভিড নেগেটিভ আসার পরও অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে, নগদ টাকায় বিল পরিশোধ করতে বাধ্য করা হয়েছে— এসব বিষয়ে ডা. ইহতেশামুল বলেন, ‘সেই সময়ে তো টাকা নেওয়ার কথা না। যদি তেমন কারও সঙ্গে হয়ে থাকে, আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলবেন।’ তাদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি আবার বলেন, ‘উনাদের আমাদের সঙ্গে দেখা করতে বলবেন।’

কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় ফ্যাভিরাপিরাভির ব্যবহার করা হয়েছে। এর কোনো অনুমোদন রয়েছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোভিড-১৯ একটি নতুন রোগ। এখানে অনেক কিছুই দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। দেখা গেল আজ যে ওষুধের অনুমতি আছে, কাল সেই ওষুধকে অকার্যকর বলা হচ্ছে। আমরা তো চেষ্টা করি রোগীদের সব ধরনের সাহায্য করার জন্য। আর তাই হয়তো এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, সরকার যেসব হাসপাতালের নাম ঘোষণা করেছে, সেসব স্থানে চিকিৎসার বিনিময়ে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি সেটা নেওয়া হয়ে থাকে, সেটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আমরা এমন অভিযোগ পাচ্ছি। আসলে দেশের এমন দুর্যোগে বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে আমরা সহযোগিতা আশা করেছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের সহযোগিতার নামে জিম্মি করে যাচ্ছে।

হাবিবুর রহমান বলেন, ৩১ মে পর্যন্ত আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে কোনো রোগীর কাছ থেকে যদি টাকা-পয়সা নেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে নিয়েছে। সরকারের সঙ্গে করা সমঝোতা চুক্তি বাতিল করে তারা ১ জুন থেকে নিজেদের মতো করে চিকিৎসা দিচ্ছে। এক্ষেত্রে এর আগের তারিখগুলোতে কেনো টাকা নেবে, সেটা প্রশ্ন। বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনকও।

এ বিষয়ে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, বা কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে মো. হাবিবুর রহমান বলেন, এটা আসলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল অনুবিভাগ) বলতে পারবেন।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল অনুবিভাগ) মো. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা  হলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।’

এর আগে, গত ১৬ মে রাজধানীতে কোভিড-১৯ হাসপাতাল হিসেবে ২০০ বেডের আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।  প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ড. আনোয়ার হোসেন খান মানবতার কল্যাণে এই হাসপাতালের কাজ করে যাওয়ার কথা বলেন। এই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বিনিময়ে কোনো অর্থ উপার্জন বা রোগীর সঙ্গে ব্যবসা করা হবে না বলেও অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন তিনি।

 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ