দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার তিন মাস পূর্ণ হলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তিন মাস ছিল গুরুত্বপূর্ণ সময়। তবে সেই সময় পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। অনেকটা উদ্দেশ্যহীন, পরিকল্পনাহীন ও সমন্বয়হীন কাজের মধ্য দিয়ে মহামারির তিন মাস পার করেছে বাংলাদেশ। আগামী তিন মাসে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়েও জনমনে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে।
মৃত্যু আর আক্রান্তের পরিসংখ্যান কোথায় গিয়ে শেষ হবে, সেই প্রশ্নে আতঙ্কিত জনগণ।
এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শুরু থেকেই নানা সিদ্ধান্তহীনতায় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো। ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছে সরকার। কখন কী পদক্ষেপ নেয়া হবে তা নিয়ে চলছে অস্থিরতা। সরকারি ছুটি, লকডাউন, কারখানা বন্ধ-খোলা, গণপরিহন চালু এসব নিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়েছে ক্ষণে ক্ষণে। এসব কারণে ৬৬ দিনের টানা ছুটি এবং অঘোষিত লকডাউন শেষেও করোনা সংক্রমণ থামানো যায়নি। একের পর এক সরকারি ছুটি বাড়ানো হলেও তখন সারা দেশে লকডাউন করা হয়নি। সরকার ঘোষিত সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে মাঠে কাজ করে অনেক পুলিশসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, চিকিৎসকসহ স্বেচ্ছাসেবীরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। পরিস্থিতি ক্রমে অবনতি হওয়ায় এবার সরাসরি লকডাউনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, জোনভিত্তিক লকডাউন দেয়া হবে। এজন্য আগে থেকেই জোন চিহ্নিত করা হয়েছে।
রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত এলাকা পুরো লকডাউন করে দেয়া হবে। তবে কবে কোথায় কিভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন হবে এ নিয়ে সরকারি কোন নির্দেশনা জারি করা হয়নি। আসেনি কোন ঘোষণাও। এ অবস্থার মধ্যেই রোববার সকাল থেকে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত সরকারি ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত তথ্যচিত্র প্রকাশ করা হয়। সেখানে দেখা যায় দেশের ৫০ টি জেলা এবং ৪০০ টি উপজেলাকে রেড জোন চিহ্নিত করে পুরো লকডাউন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। করোনার হটস্পট ঢাকাকে রেড জোনে না ফেলে এখানে ৩৮টি স্থানে আংশিক লকডাউন এলাকা দেখানো হয়। এই চিত্র নিয়ে দিনভর দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানামুখি প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কোন কোন গণমাধ্যম এই তথ্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে দুপুরে। এরপরই দেখা যায় ওই ওয়েবসাইট থেকে আগে দেয়া সব তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। এ নিয়ে স্বাস্থ্যঅধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কোন ঘোষণা ছাড়া লকডাউনের তথ্য প্রকাশ করায় স্থানীয় প্রশাসনও বিভ্রান্তিতে পড়ে। তারা ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও এ সংক্রান্ত কোন নির্দেশনা পায়নি। ওদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তরফে বলা হয়েছে জোনভিত্তিক লকডাউন দেয়ার যে খসড়া প্রস্তুত হয়েছে তা প্রধামন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে তার অনুমোদন পেলেই মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। তাহলে প্রশ্ন হল, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন হওয়ার আগেই খসড়া তথ্য কেন ওয়েবসাইটে দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হল।
বিশেষজ্ঞরা অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, খসড়ায় যে তথ্য প্রকাশ পেয়েছে তাতে দেখা গেছে ঢাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। দেশের মোট আক্রান্ত মানুষের অর্ধেকই যেখানে ঢাকায় সেখানে রেড জোন ঘোষণা না করে আংশিক লকডাউনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্তহীনতায় অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এমনিতে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই স্বাস্থ্য বিভাগের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে আসছে। এর মধ্যে এমন সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন অনেকে।
দেশে করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে এলাকাভিত্তিক লকডাউনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আক্রান্তের আধিক্য বিবেচনায় রেড জোন, ইয়েলো জোন ও গ্রিন জোনে চিহ্নিত করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাস্তবায়ন হবে স্বাস্থ্যবিধি ও আইনি পদক্ষেপ। ‘গ্রিন, ইয়েলো এবং রেড জোন’- এই তিন ভাগে ভাগ করে তালিকা প্রকাশ করা হলেও এসব জোনের নাগরিকদের জন্য নতুন কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বা পুলিশের ভূমিকা কী হবে, এ বিষয়েও কোনো নির্দেশনা এখন পর্যন্ত দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ওয়েবসাইটে দেখছি। এ নিয়ে তার কাছে কোন তথ্য নেই।
করোনা প্রতিরোধ সহায়ক এই ওয়েবসাইটটি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর), সরকারের এটুআই প্রকল্প, মন্ত্রিপরিষদ ও আইসিটি বিভাগের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটে দেশের তিনটি বিভাগ, ৫০টি জেলা ও ৪০০টি উপজেলাকে পুরোপুরি লকডাউন (রেড জোন বিবেচিত) দেখানো হয়েছে। আংশিক লকডাউন (ইয়েলো জোন বিবেচিত) দেখানো হয়েছে দেশের পাঁচটি বিভাগ, ১৩টি জেলা ও ১৯টি উপজেলাকে। আর লকডাউন নয় (গ্রিন জোন বিবেচিত) এমন জেলা দেখানো হচ্ছে একটি এবং উপজেলা দেখানো হচ্ছে ৭৫টি। ঢাকা মহানগরীর ৩৮টি এলাকাকে আংশিক লকডাউন (ইয়েলো জোন বিবেচিত) হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে লকডাউন নয় (গ্রিন জোন বিবেচিত) বলে দেখানো হচ্ছে ১১টি এলাকাকে। ঢাকায় পুরোপুরি লকডাউন (রেড জোন বিবেচিত) হিসেবে কোনো এলাকাকে ওই প্রকাশিত তালিকা দেখানো হয়নি। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ওই তালিকা অনুসারে, বরিশাল বিভাগের মধ্যে পুরোপুরি লকডাউন- বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও পিরোজপুর। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন ভোলা ও ঝালকাঠি। চট্টগ্রাম বিভাগে পুরোপুরি লকডাউন- ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ফেনী, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি।
ঢাকা বিভাগের মধ্যে পুরোপুরি লকডাউন- গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও টাঙ্গাইল। এই বিভাগে শুধু ঢাকা ও ফরিদপুর আংশিক লকডাউন। খুলনা বিভাগের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা, যশোর, খুলনা, মেহেরপুর, নড়াইল ও সাতক্ষীরা পুরোপুরি লকডাউন। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও মাগুরা। খুলনা বিভাগেই দেশের একমাত্র গ্রিন জোন চিহ্নিত জেলা ঝিনাইদহ, অর্থাৎ এটি লকডাউন নয়।
রাজশাহী বিভাগের মধ্যে পুরোপুরি লকডাউন বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহী। এই বিভাগে আংশিক লকডাউন চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ। রংপুর বিভাগের আটটি জেলাই পুরোপুরি লকডাউন। জেলাগুলো হলো-দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও।
সিলেট বিভাগের সব ক’টি জেলাও পুরোপুরি লকডাউন। জেলাগুলো হলো- হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও সিলেট। ময়মনসিংহ বিভাগেরও সব ক’টি জেলা পুরোপুরি লকডাউন। এ চারটি জেলা হলো জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও শেরপুর।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগরীর আংশিক লকডাউন বলে চিহ্নিত ৩৮টি এলাকা হলো- আদাবর থানা, উত্তরা পূর্ব, উত্তরা পশ্চিম, ওয়ারী, কদমতলী, কলাবাগান, কাফরুল, কামরাঙ্গীরচর, কোতোয়ালি, খিলক্ষেত, গুলশান, গেন্ডারিয়া, চকবাজার, ডেমরা, তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, দক্ষিণখান, দারুসসালাম, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, পল্টন মডেল, পল্লবী, বংশাল, বাড্ডা, বিমানবন্দর, ভাটারা, মিরপুর মডেল, মুগদা, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, রমনা মডেল, লালবাগ, শাহআলী, শাহজাহানপুর, শেরেবাংলা নগর, সবুজবাগ, সূত্রাপুর ও হাজারীবাগ থানা এলাকা। লকডাউন নয় বলে চিহ্নিত ১১টি এলাকা হলো- উত্তরখান থানা, ক্যান্টনমেন্ট থানা, খিলগাঁও, তুরাগ, বনানী, ভাষানটেক, মতিঝিল, রামপুরা, রূপনগর, শাহবাগ ও শ্যামপুর থানা এলাকা।
জানা যায়, ঢাকায় দুটি এলাকায় পাইলটিং হিসেবে লকডাউনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত আছে। এটি কবে ঘোষণা হবে তা নিশ্চিত নয়। সূত্রের দাবি প্রধানমন্ত্রী খসড়া অনুমোদন করলে আজ-কালের মধ্যে প্রজ্ঞাপন হতে পারে। প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেই সারা দেশে নির্দেশনা দেয়া হবে। তবে স্থানীয়ভাবে লকডাউন বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে ক্ষমতা দেয়া হবে।