কর্ণফুলী গ্যাসে মধ্যরাতের পদোন্নতি পেলেন ৩৭ ‘ভুয়া’ কর্মকর্তা

  • চট্টগ্রাম প্রতিদিন
  • ২০২০-০৮-২৪ ১৪:৫৬:১৬
ক্রাইম প্রতিদিন

নিয়োগ পরীক্ষায় তারা পাশই করতে পারেননি। অনেকের ছিল না শিক্ষাগত যোগ্যতাও। তবু ১০ বছর আগে ৩৭ জন লোক ‘নিয়োগ’ পেয়েছিলেন সহকারী ব্যবস্থাপক পদে। জালিয়াতি ধামাচাপা দিতে এমনকি তাদের কোনো নথিপত্রও রাখা হয়নি। এদের নিয়োগ পরীক্ষার কোনো নথি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার খাতা কিছুই পাওয়া যায়নি। কারও কারও সনদও জাল। কেউ কেউ পাশের আগে পাশ দেখিয়ে সার্টিফিকেট জমা দিয়েছেন নিয়োগের সময়। এমন নজিরবিহীন কাণ্ডে নিয়োগ পাওয়া সেই কথিত ‘কমকর্তারা’ গত ১০ বছরে এমনকি পদোন্নতিও বাগিয়ে নিয়েছেন।

গত বছর এ ঘটনা জেনে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেই তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে। ঠিক এমন সময়েই গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাত ১২টার দিকে ওই ৩৭ জন কথিত কর্মকর্তাকে আবার পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এমন অবাক কাণ্ড ঘটেছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে (কেজিডিসিএল)।

অভিযোগ রয়েছে, কেজিডিসিএলে কর্মরত অবৈধ এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত চলমান থাকার পরও দুদকের ‘ভুয়া ক্লিয়ারেন্স’ দেখিয়ে গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাত ১২টার দিকে তড়িঘড়ি সবাইকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। নজিরবিহীন অনিয়ম করে এইসব কথিত কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় যেখানে দুদকের তদন্ত চলছে, এমনকি অভ্যন্তরীণ তদন্তেও যেখানে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনার প্রমাণ মিলেছে, সেখানে কথিত ওইসব কর্মকর্তাকে চাকরি বরখাস্ত করা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র, অথচ রাতারাতি উল্টো তাদের পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনায় কেজিডিসিএলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা যায়, সরকারি চাকরি বিধি এবং কর্ণফুলী গ্যাসের সার্ভিস রুলস অনুযায়ী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে ক্লিয়ারেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। জানা গেছে, কেজিডিসিএলের সাবেক কর্মকর্তা আইয়ুব খানের ছেলে মহিউদ্দিন চৌধুরী ২০১১ সালে অনার্স পাশ না করেই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি ২০১৭ সালে উপ-ব্যবস্থাপক হন। ২০২০ সালের ২০ আগস্ট ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতিও পান। অথচ মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ওই ব্যাচের পদোন্নতি পাওয়া ৩৭ জন কর্মকর্তার কারোরই কোনো নথিপত্র ছিল না কেজিডিসিএলে। এমনকি ওই নিয়োগ পরীক্ষায় কেউ পাশও করেনি।

দুদক সূত্রে আরও জানা যায়, আইয়ুব খানের আরেক ছেলে আশেক উল্লাহ চৌধুরী ২০১৫ সালে উপ-ব্যবস্থাপক পদে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এ বিষয়ক সরকারি নথিপত্রগুলো দুদকের কাছে জব্দ রয়েছে।

কিন্ত তড়িঘড়ি করে গত (২০ আগস্ট) রাত বারটার দিকে ৫৫ জনের পদোন্নতি দেওয়া হয়। অথচ যেখানে তাদের বেতন ভাতা ও চাকরি বরখাস্ত হওয়ার কথা ছিলো, সেখানে উল্টো সবার পদোন্নতিতে হতভাগ ও সংশয় সৃৃষ্টি করেছে।

২০১০ সালের ১১ ডিসেম্বর দৈনিক সমকাল পত্রিকায় একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কেজিডিসিএল। ওই বিজ্ঞপ্তিতে মোট ২০টি পদে আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা পদের মধ্যে ছিল সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল/মেকানিক্যাল/কেমিক্যাল/ইলেকট্রিক্যাল), সহকারী ব্যবস্থাপক (সাধারণ), সহকারী ব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব), সহকারী কর্মকর্তা (সাধারণ), সহকারী কর্মকর্তা (অর্থ ও হিসাব), উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল/মেকানিক্যাল/কেমিক্যাল/ ইলেকট্রিক্যাল/ অটোমোবাইল)।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোন নিয়ম না মেনে ও অসৎ উপায়ে ৩৮ জন পরীক্ষার্থীকে নিয়োগ দিয়েছে কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ। এদের মধ্যে মাত্র ৬ জন পরীক্ষার্থীকে মেধাতালিকায় পাওয়া গেছে। বাকি ৩২ জন পরীক্ষার্থীর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার কোনো নথিপত্রই পাওয়া যায়নি। এছাড়া ২০টি পদের স্থলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৩৮ জনকে। অধিকাংশ নিয়োগই আর্থিক লেনদেন, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাবশালীর তদবিরে হয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

মধ্যরাতের এই পদোন্নতির বিষয়টি নিশ্চিত করে কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. ফিরোজ খান বলেন, ‘আমি ছুটিতে রয়েছি। তবে কেজিডিসিএলের গঠিত কমিটির পক্ষ থেকে এই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে কমিটির লোকজনই ভাল বলতে পারবেন। হয়তো সেখানে নিয়ম মেনে পদোন্নতি দিতে পারে। এর বেশি কিছু বলতে পারব না।’

কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমদ মজুমদারের সরকারি মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলে সেখান থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।

অন্যদিকে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশন জেলা সমন্বিত কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর তদন্ত কর্মকর্তা ও উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি।

 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ