নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে ক্রেতারা

  • ক্রাইম প্রতিদিন ডেস্ক
  • ২০২০-১০-০৩ ০০:৪৮:৩৯
Crime Protidin, Bangla News, Crime News, Breaking News, Politics, Economies, National, International, Sports, Entertainment, Lifestyle, Tech, Education, Photo, Video

রাজধানীর বাজারগুলোতে শীতের সবজির আগাম সরবরাহ যেকোনও সময়ের চেয়ে এখন বেশি। তবে সেই তুলনায় দামও বেশি। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে মানুষের আয় না বাড়লেও অব্যাহতভাবে সবজির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। সেগুনবাগিচা, মগবাজার ও কাওরান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

এতদিন সবজির মূল্যবৃদ্ধির জন্য দীর্ঘস্থায়ী বন্যার অজুহাত দেওয়া হচ্ছিল। আর এখন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে দাম আরও বাড়তির দিকে। 

বাজারগুলোতে সরেজমিন দেখা যায়, পাঁচ-ছয় ধরনের সবজির দাম ১০০ টাকার ওপরে। আট-দশ ধরনের সবজির দাম ৬০ টাকার বেশি। অন্য পাঁচ-ছয় ধরনের সবজির দাম ৫০ টাকার ওপরে। আর তিন-চার ধরনের সবজির দাম ৪০ টাকার ঘরে।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) কাওরান বাজারে খবর নিয়ে জানা গেছে, প্রতিকেজি শিম, পাকা টমেটো, গাজর, বেগুন ও বরবটি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকার বেশি দামে। এরমধ্যে পাকা টমেটোর দাম প্রতিকেজি ১২০-১৪০ টাকা। শিমের কেজি ১২০-১৪০ টাকা। গাজর বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি দরে। বরবটির কেজি কোথাও ১০০ টাকা, কোথাও ১২০ টাকা। বেগুনের কেজি এখন ১১০ টাকা হয়ে গেছে।

এসব সবজির দাম বৃষ্টির কারণে ১০০ টাকার ওপরে উঠেছে বলে দাবি করেন কাওরান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন,  ‘এগুলো ঢাকায় কম আসে। কিন্তু চাহিদা বেশি থাকায় দাম বাড়তি।

আরও পড়ুন: করোনায় আক্রান্ত ট্রাম্প ও মেলানিয়া
 
সবজি বাজার কাওরান বাজারের খবর নিয়ে জানা গেছে, এককেজি পটলের দাম এখন ৬০-৭০ টাকা। প্রতিকেজি ঝিঙা ৭০ টাকা। কাঁকরোল বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৬০ টাকা। লাউ প্রতি পিস ৭০-৮০ টাকা।

বাজারে নতুন আসা ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতিটি বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকায়। মুলা প্রতিকেজি ৩০-৫০ টাকা।

ক্রেতাদের দাবি, পেঁপে ২০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪০-৫০ টাকা কেজি। ১২ টাকা হালি কাঁচা কলা কিনতে হয় ৪০-৫০ টাকায়। কাঁচামরিচের দাম এখন ২৫০ গ্রাম ৬০ টাকা। দেশি পেঁয়াজের কেজি ৯০ টাকা। আলু বিক্রি হচ্ছে ৪২ টাকায়।

মানিকনগর এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, ‘ছোট একটা ব্যবসা করি, করোনার কারণে আগের মতো লাভ হচ্ছে না। কিন্তু বাজারে গেলে হতাশ হতে হয়। টাকা ফুরিয়ে যায়, কিন্তু বাজারে সবজি কেনার যেন উপায় নেই।’

সাধারণ এই ক্রেতার ভাষ্য, ‘বাজার সবজিতে ভরপুর, তবু সব সবজির দাম বেড়েছে। বেশিরভাগ সবজির দাম ১০০ টাকার ওপরে বা ১০০ টাকার কাছাকাছি।’

এ দিকে, চাল ও ভোজ্যতেলের বাজারে লাগাম নেই; ঊর্ধ্বমুখী গতিতে থাকা এই দুটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত সপ্তাহের চেয়ে আরও বেড়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি চার থেকে পাঁচ টাকা করে বেড়েছে বলে রাজধানীর খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন। অন্যদিকে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে চার থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চাল বিক্রেতারা।

বাজার নিয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি না থাকার কারণেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে বলে মনে করছেন ক্রেতা সাধারণ। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো কোনো ব্র্যান্ডের এক লিটারের বোতলের দাম চার থেকে পাঁচ টাকা বেড়ে ১১৪-১১৫ টাকা হয়েছে।

দুই লিটারের বোতলের দাম করা হয়েছে সর্বোচ্চ ২২৬ টাকা। আর পাঁচ লিটারের সয়াবিনের বোতলের নতুন দাম ৫৫০-৫৫৫ টাকা করা হয়েছে।

একমাসের ব্যবধানে দুইবার সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে বলে ক্রেতা-বিক্রেতারা জানিয়েছেন। বাড়তি দামের পণ্য খুচরা বাজারে এখনও না পৌঁছালেও ডিলাররা আগেই জানিয়ে দিচ্ছেন বলে খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান।

মহাখালী কাঁচাবাজার এলাকার মার্জিয়া স্টোরের বিক্রেতা খুরশেদ আলম জানান, তার দোকানে নতুন দামের তেল এসেছে। প্রায় সব কোম্পানিই বোতলজাত সয়াবিন তেলে লিটার প্রতি পাঁচ টাকা বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, “রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেলের পাঁচ লিটার বোতলের গায়ের মূল্য এখন ৫৫০ টাকা। এক মাস আগেও এটি ছিল ৫২৫ টাকা।

“দুই লিটার বোতলের দাম ২২৬ টাকা, এটি ছিল ২১৬ টাকা। এক লিটার ১১০ টাকা থেকে দাম বাড়িয়ে করা হয়েছে ১১৫ টাকা এবং ৫০০ গ্রাম ওজনের বোতলের দাম ৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৮ টাকা করা হয়েছে।”

রামপুরা কাঁচাবাজারের মুদি দোকানি মাইদুল ইসলাম মাহিন জানান, তারা আগের দামের তেলই বিক্রি করছেন। শনিবার থেকে বাড়তি দামে ডিলাররা তেল দিয়ে যাবে বলে জানান।

তিনি বলেন, “শুনছি তেলের দাম আরেক দফা বাড়ানো হচ্ছে। ফ্রেশ ব্র্যান্ডের এক লিটার সয়াবিনের দাম ১১৪ টাকা; এটি ছিল ১১০ টাকা। ফ্রেশের পাঁচ লিটারের মূল্য করা হয়েছে ৫৫০ টাকা।”

শান্তিনগর বাজারের মমতা স্টোরের মালিক দেলোয়ার হোসেন বলেন, “নতুন দামে তেল এখনও আমাদের দোকানে আসেনি। তবে যেসব তেল বিক্রি করলে আমাদের ১০-১৫ টাকা থাকতো, সেখানে ডিলাররা আরেকটু বেশি দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যে কারণে আগে বোতলের গায়ের মূল্য থেকে ক্রেতাদের আমরা একটু ছাড় দিতে পারলেও এখন তা সম্ভব হচ্ছে না।”

রামপুরা বাজারে মালিবাগ হাজিপাড়া এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, “তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। এর কারণ, সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল।

“মিডিয়াতে যেগুলো নিয়ে লেখালিখি হয় কেবল সেগুলো নিয়েই সরকারের লোকেরা কিছুটা দৌঁড়ঝাপ দেয়। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব হলো- কঠোর অবস্থান নিয়ে মনিটরিং করা। সেটা আমরা দেখছি না।”

বাজারে বোতলজাত সয়াবিল তেলের অন্যতম বড় সরবরাহকারী সিটি গ্রুপ তীর ব্র্যান্ডের নামে তেল সরবরাহ করে।

রাজধানীর খুচরা বাজারে সবচেয়ে কম দামের মোটা স্বর্ণা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজিতে। আর সরু মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৬২ থেকে ৬৫ টাকায়। রামপুরার বিক্রমপুর রাইস স্টোরের মালিক আলী আহসান বলেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম কেজিতে তিন থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছ। বিশেষ করে মোটা চালের দাম একটু বেশি।

তিনি জানান, মানভেদে মিনিকেট চালের প্রতি ৫০ কেজির বস্তা দুই হাজার ৮০০ টাকা থেকে তিন হাজার টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। আর মোটা চালের বস্তা দুই হাজার ৪৫০ টাকা থেকে দুই হাজার ৫৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

চালের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতা আলী আহসান বলেন, “বলা হচ্ছে ময়ালে (কৃষকের গোলা) ধানের দাম বেড়েছে। যে কারণে মিলাররা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। “তবে আসল ঘটনা কী সেটা তো আমরা এখানে বসে থেকে বলতে পারব না।”

বাজারে সবজি ও মুরগির দাম প্রায় সমান
সবজির বাজার এখন ব্যাপক চড়া। পরিস্থিতি এখন এরকম যে বয়লার মুরগি আর কোন কোন সবজির দাম প্রায় একই। বন্যার পানি উত্তরাঞ্চলে ফের বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর বাজারে সবজির দাম আবারও বাড়ছে দ্রুতগতিতে। বিক্রেতারাও পরামর্শ দিচ্ছেন সবজরি বদলে বয়লার মুরগি খেতে। তাহলে হয়ত সবজির দাম কমতে পারে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে কয়েকটি সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একশ টাকার ওপরে এখন কেজি বিক্রি হচ্ছে। এদিকে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ৫ টাকা কমে কিছু সবজির প্রায় সমান দামে বিক্রি হচ্ছে। 

ব্যবসায়ীরা জানান, প্রথম দফায় বন্যার কারণে সবজির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরে বাজারে সবজির দাম কিছুটা কমছিল। এখন আবার বন্যার পানি ও টানা বৃষ্টির কারণে বাজারে সবজির সরবরাহ কমে আসায় দাম বাড়ছে দ্রুতগতিতে। এদিকে বন্যার পানি বাড়ার কারণে বাজারে ব্রয়লার মুরগির সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমছে।

এছাড়া নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে বোতলজাত সয়াবিন তেলের লিটারে আরেক দফায় ৫ টাকা বাড়াচ্ছে পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো। মিলগেট চালের দাম কমলেও খুচরা বাজারে এখনও কোন প্রভাব পড়েনি। তবে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা কমেছে।

 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ