শীর্ষ দুর্নীতিবাজকে বাঁচাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন কৌশল!

  • ক্রাইম প্রতিদিন ডেস্ক
  • ২০২০-০৬-১৯ ০২:৩৩:৩১
image

যখন সারাদেশে আলোচিত হচ্ছিলো স্বাস্থ্যখাতের গডফাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর দুর্নীতি, লুটপাট ও নানা অপকর্মের কথা আর তখনই এই শীর্ষ দুর্নীতিবাজকে বাঁচাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নতুন এক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত ৯ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতরকে লেখা এক চিঠিতে ১৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং এর মালিককে কালো তালিকাভুক্ত করার কথা জানিয়েছে। কিন্তু কালো তালিকাভুক্ত করা এই ১৪ জন ঠিকাদারের মধ্যে মিঠু বা তার প্রতিষ্ঠানের নাম নেই। অর্থাৎ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এটা বোঝাতে চাইছে যে, মিঠু দুর্নীতিবাজ নয়, অন্য এই ১৪ ঠিকাদার দুর্নীতিবাজ! 

অথচ স্বাস্থ্যখাতের যে কেউ, এমনকি স্বাস্থ্যখাতের বাইরেরও সাধারণ সচেতন মানুষমাত্রই জানেন, এ খাতে দুর্নীতির গডফাদার কে? নিয়ম অনুযায়ী, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির জন্য কাউকে কালো তালিকাভুক্ত করতে হলে প্রথমেই আসবে মিঠুর নাম। এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে অন্য যেসব দুর্নীতিবাজ রয়েছে তারা মিঠুর তূলনায় শিশুমাত্র। যে ১৪ জন ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছে তাদেরকে মিঠুর তূলনায় ‘চুনোপুঁঠি’ হিসেবেই আখ্যায়িত করছেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা। 

কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) বিদায়ী পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহ গত ৩০ মে জনপ্রশাসন সচিব বরাবর লেখা এক চিঠিতে স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতির কিছু তথ্য তুলে ধরেন। তাতে তিনি স্পষ্টভাবেই ঠিকাদার মিঠুর নাম উল্লেখ করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে ঠিকাদার মিঠু কীভাবে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন সেই তথ্যও চিঠিতে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) বিদায়ী পরিচালক। সিএমএসডি পরিচালকের ওই চিঠিতে মন্ত্রী, মন্ত্রীর ছেলে, মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সিরাজুল ইসলাম, মন্ত্রীর পিএস ওয়াহিদুর রহমানের নামও উল্লেখ করেন। সিএমএসডি পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহ টিভি চ্যানেলসহ অন্যান্য গণমাধ্যমেও এই দুর্নীতির সিন্ডিকেটের তথ্য তুলে ধরেন। ফলে এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে স্বাস্থ্যখাতসহ সর্বত্র ব্যাপক তোলপাড় বয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসচিব আসাদুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব সিরাজুল ইসলাম, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পিএস ওয়াহিদুর রহমানকে দুর্নীতির দায়ে ইতিমধ্যে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু এই দুর্নীতির মূল হোতা মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় বা দুদক এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো এখন মিঠুকে বাঁচাতেই তাকে বাদ দিয়ে অন্য ‘চুনোপুঁঠি’ ঠিকাদারদের কালো তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত ৯ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতরকে লেখা তাদের চিঠিতে দুদকের যে চিঠির কথা উল্লেখ করেছে সেটি অতি পুরানো। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে ওই চিঠিটি লিখেছিলো দুদক। চিঠিটির কপি তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরকেও দেয়া হয়েছিল। দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত স্বাক্ষরিত ‘ঠিকাদার কালো তালিকাভুক্তি’র ওই চিঠি নিয়ে তখনই ব্যাপক বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। কারণ, স্বাস্থ্যখাতের শীর্ষ দুর্নীতিবাজের নামই এ তালিকায় ছিল না। প্রবল বিতর্কের কারণে দুদকের এ চিঠির কার্যকারিতা তখন অঘোষিতভাবেই বাতিল হয়ে যায়। 

কিন্তু দীর্ঘ ছয় মাস পরে কেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হঠাৎ নতুন করে দুদকের ওই একপেশে ও বিতর্কিত চিঠি নিয়ে কাজ শুরু করলো এর কোনো উত্তর দিতে পারছেন না মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গত ৯ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতরকে লেখা এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপসচিব হাসান মাহমুদ। মুঠোফোনে শীর্ষনিউজ ডটকমের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে উপসচিব হাসান মাহমুদকে প্রশ্ন করা হলে যুক্তিসঙ্গত কোনো উত্তর দিতে তিনি পারেননি। 
দুর্নীতির দায়ে বদলি হওয়া সচিব আসাদুল ইসলামের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে শেষ কর্মদিবস ছিল গত ৮ জুন। তিনি এ মন্ত্রণালয় থেকে যাবার মুহূর্তে ৮ জুনই ঠিকাদার কালো তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত একপেশে এই বিতর্কিত ফাইলে স্বাক্ষর করে যান। আসাদুল ইসলাম ইতিপূর্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন। ফলে সবকিছু তার নখদর্পণে ছিল। সচিব হবার পর থেকেই আসাদুল ইসলাম নানাভাবে দুর্নীতির গডফাদার মিঠুর স্বার্থ রক্ষা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ মন্ত্রণালয় থেকে যাবার মুহূর্তেও মিঠুর স্বার্থরক্ষা করছেন। এর পরদিনই ৯ জুন আসাদুল ইসলাম সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতি পান। মিঠুই বিদেশ থেকে তদবির করে তাকে এ পদোন্নতিতে সহযোগিতা করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।  

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে সেগুলো হলো-  স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেরানি আবজাল হোসেনের স্ত্রী রুবিনা খানমের রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও রূপা ফ্যাশন, পুরানা পল্টনের আবদুস সাত্তার সরকার ও মো. আহসান হাবীবের মালিকানাধীন মেসার্স মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, তোপখানা রোডের জাহেরউদ্দিন সরকারের মালিকানাধীন বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আসাদুর রহমানের মালিকানাধীন ইউনিভার্সেল ট্রেড করপোরেশন, মুন্সী ফররুখ হোসাইনের মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজ, এএসএল ও প্রতিষ্ঠানটির এমডি আফতাব আহমেদ, ঢাকার মিরপুরের আবদুল্লাহ আল মামুনের মালিকানাধীন অনিক ট্রেডার্স, রংপুরের মনজুর আহমেদের মালিকানাধীন মেসার্স ম্যানিলা এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স এসকে ট্রেডার্স, মোসাদ্দেক হোসেনের মালিকানাধীন এমএইচ ফার্মা, জয়নাল আবেদীনের মালিকানাধীন মেসার্স অভি ড্রাগস, আলমগীর হোসেনের মালিকানাধীন মেসার্স আলবিরা ফার্মেসি, মো. মিন্টুর মালিকানাধীন এসএম ট্রেডার্স ও ঢাকার মোকছেদুল ইসলামের মালিকানাধীন বেয়ার এভিয়েশন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে স্বাক্ষরকারী উপসচিব হাসান মাহমুদকে মুঠোফোনে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কালো তালিকাভুক্তির জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম এসেছে তাতে ঠিকাদার মিঠু বা তার প্রতিষ্ঠানের নাম না থাকাটা আপনার দৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত কিনা, এ প্রশ্নের কোনো জবাব তিনি এ প্রতিবেদককে দিতে পারেননি। 

উল্লেখ্য, ২০০৯ সাল থেকেই ঠিকাদার মিঠু গোটা স্বাস্থ্যখাত দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। এ খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তিনি নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন, যার অধিকাংশই বিদেশে পাচার করেছেন। স্বাস্থ্যখাতের আজকের যে দুরবস্থা তারজন্য প্রধানতঃ এই গডফাদার মিটুকেই দায়ী করা হয়। ২০০৯ সালের মহাজোট সরকারের প্রথম মন্ত্রী রুহুল হকের ছেলে জিয়াউল হক ছিলেন মিঠুর বিজনেস পার্টনার। ২০১১ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনেই এ তথ্য উল্লেখ করা হয়। ২৩ জুলাই, ২০১২ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর লিড নিউজ ছিল- ‘স্বাস্থ্যখাতে হরিলুট: মন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাবান মিঠু।’ বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার ৫ আগস্ট, ২০১২ এর সংখ্যায় ছাপা হয়- ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রক কে এই মিঠু?’ ২০১৪ সালে মন্ত্রী পরিবর্তন হলেও স্বাস্থ্যখাতের উপর গডফাদার মিঠুর নিয়ন্ত্রণ কোনো অংশেই কমেনি, বরং বেড়েছে। বিগত সময়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আর বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং তার ছেলের উপর মিঠুর নিয়ন্ত্রণের কথাতো সবশেষে সিএমএসডির বিদায়ী পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহিদউল্লাহর চিঠিতেই উল্লেখ রয়েছে!

অবাক ব্যাপার হলো, সাম্প্রতিক সময়ে এন-৯৫ মাস্ক ক্রয়ের যে দুর্নীতি আলোচনার শীর্ষে সেই জেএমআই গ্রুপ কিংবা এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আব্দুর রাজ্জাকের নামও এই কালো তালিকায় নেই!

 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ